উচ্চ হারে কর, ব্যয়বহুল জ্বালানি, বেশি গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জ এবং ঢাকা বিমানবন্দরের একমাত্র রানওয়েতে জটের কারণে এয়ারলাইনসগুলোর পরিচালন ব্যয় বাড়ছে। শেষ পর্যন্ত এই বাড়তি খরচ যাত্রীদের টিকিটের দামের ওপরই চাপছে।
গতকাল শনিবার রাজধানীতে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বিশ্বমানের এভিয়েশন’ শীর্ষক নীতি সংলাপে এই কথা জানান ইউএস-বাংলা গ্রুপ ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মামুন। দৈনিক বণিক বার্তা এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
মামুন বলেন, ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরগামী একজন যাত্রীকে সরকারি কর ও আবগারি শুল্ক হিসেবে প্রায় ৯ হাজার ৮৯০ টাকা দিতে হয়। এর বিপরীতে কুয়ালালামপুর থেকে ঢাকায় আসার ক্ষেত্রে এই খরচ ২ হাজার টাকার আশপাশে। দুই দিকের মধ্যে পার্থক্য প্রায় ৭ হাজার টাকা।
একইভাবে ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুরগামী একজন যাত্রীকে প্রায় ৯ হাজার ৮৯০ টাকা কর দিতে হয়। বিপরীতে সিঙ্গাপুর থেকে ঢাকায় আসার ক্ষেত্রে এই খরচ প্রায় ৫ হাজার ৮০০ টাকা।
ঢাকা থেকে মাসকাট যাওয়ার ক্ষেত্রে কর ও শুল্কের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার টাকা। ফেরার পথে তা প্রায় ৩ হাজার টাকা।
অন্যদিকে দুবাই থেকে ঢাকায় আসার ক্ষেত্রে এই খরচ প্রায় ৪ হাজার টাকা। ঢাকা থেকে দুবাই যাওয়ার ক্ষেত্রে তা প্রায় ১০ হাজার টাকা।
মামুন বলেন, ‘ভাড়া বেশি হবেই।’ তার বক্তব্য, এয়ারলাইনসকে এসব বাড়তি খরচ টিকিটের দামের মধ্যে হিসাব করতে হয়।
দেশীয় রুটেও এই খরচের চাপ রয়েছে বলে জানান তিনি। ঢাকা থেকে যশোর যেতে একজন যাত্রীর টিকিটে ৫০০ টাকা ভ্যাট এবং ২০০ টাকা কর দিতে হয়। সব মিলিয়ে বিমানবন্দর-সংশ্লিষ্ট খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ২০০ টাকা।
জ্বালানির খরচও এয়ারলাইনসগুলোর জন্য বড় সমস্যা বলে উল্লেখ করেন মামুন। তার দাবি, বাংলাদেশে বর্তমানে বিমানের জ্বালানির দাম কলকাতার চেয়ে বেশি।
গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জেও বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে বলে জানান তিনি। মামুন বলেন, কুয়ালালামপুরে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্য ইউএস-বাংলাকে প্রায় ৯৭ হাজার টাকা দিতে হয়। অথচ একই সেবার জন্য ঢাকায় আসা একটি মালয়েশীয় এয়ারলাইনসকে প্রায় ৩ লাখ টাকা দিতে হতে পারে।
কুয়ালালামপুরে একটি বোয়িং উড়োজাহাজের অ্যারোনটিক্যাল, ওভারফ্লাইং ও পার্কিং চার্জ মিলিয়ে খরচ হয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা। বাংলাদেশে শুধু গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের জন্যই খরচ হতে পারে ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত।
তিনি বলেন, একটা এয়ারলাইনস শেষ পর্যন্ত কোনো দেশে অবতরণ ও পরিচালনায় কত খরচ হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করেই টিকিটের দাম নির্ধারণ করে।
বিমান চলাচল খাতের বিকাশে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন মামুন। তিনি বলেন, কলকাতা ও কুয়ালালামপুরে চারটি করে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং কোম্পানি রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে একাধিক প্রতিষ্ঠানকে এই সেবা দেওয়ার সুযোগ দিতে এখনো অনীহা রয়েছে। কারণ এতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়।
মামুন বলেন, ইউএস-বাংলা ২০২৩ সালে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং সেবার সনদ পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিয়ম ও আন্তর্জাতিক সনদ অনুযায়ী এই সেবা দেওয়ার সক্ষমতাও তাদের রয়েছে। তবে এখনো লাইসেন্স পাননি।
তিনি আরও বলেন, কিছু বড় বিদেশি এয়ারলাইনস টিকিট বিক্রির কমিশন না দিলেও বাংলাদেশের এয়ারলাইনসগুলোকে এই কমিশন দিতে হয়।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের একমাত্র রানওয়েটিও এয়ারলাইনসগুলোর খরচ বাড়াচ্ছে বলে জানান মামুন।
তিনি বলেন, জটের কারণে ট্যাক্সিওয়েতে উড়োজাহাজকে ১০ থেকে ২০ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত জ্বালানি পুড়ছে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বোয়িং উড়োজাহাজে অতিরিক্ত ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি জ্বালানি খরচ হতে পারে। এয়ারবাসের ক্ষেত্রে এই পরিমাণ প্রায় ৯০০ কেজি। আর এটিআর উড়োজাহাজে প্রায় ৭৫ কেজি।
মামুন বলেন, রানওয়ের সংকটের কারণে ইউএস-বাংলার প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে।
তৃতীয় টার্মিনালের পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন মামুন। তার অভিযোগ, দেশীয় এয়ারলাইনসগুলোর প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তাদের সঙ্গে যথাযথভাবে আলোচনা করা হয়নি।
তিনি বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল কার জন্য? প্রথমত, এটি অপারেটরদের জন্য। কারণ অপারেটররাই যাত্রীদের সেবা দেয়।
বাংলাদেশকে এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য পূরণে দেশীয় এয়ারলাইনসই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন মামুন। বিদেশি এয়ারলাইনসের ওপর এ ক্ষেত্রে নির্ভর করে এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের এয়ার ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সদস্য এয়ার কমোডর মো. নুর-ই-আলম বলেন, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বর্তমানে ঘণ্টায় প্রায় ২০ থেকে ২২টি ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব।
হাইস্পিড ট্যাক্সিওয়ে চালু হলে উড়োজাহাজের রানওয়েতে অবস্থানের সময় কমবে। এতে ঘণ্টায় ২৬ থেকে ২৮টি ফ্লাইট পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে আশা করছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
তিনি একটি মাত্র রানওয়ে থাকার সীমাবদ্ধতার কথাও স্বীকার করেন। আরেকটি রানওয়ে নির্মাণের বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। তবে বিমানবন্দরের আশপাশে ব্যাপক উন্নয়নকাজ এবং জায়গার সংকটের কারণে নতুন রানওয়ে ও এর আনুষঙ্গিক অবকাঠামো তৈরি করা কঠিন।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, সরকার ৪২ বছর পর বেসামরিক বিমান চলাচলের নিয়ম পরিবর্তন করছে। এই প্রক্রিয়ায় খাতসংশ্লিষ্টদেরও যুক্ত করতে চায় সরকার।
এয়ারলাইনস প্রতিনিধিদের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকার সংশ্লিষ্টদের মতামত দেওয়ার সুযোগ দিতে চায়। নিয়ম চূড়ান্ত করার আগে তাদের সঙ্গে বৈঠকও করা হবে।

