অর্থনীতির আকারের তুলনায় বাংলাদেশের সরকারি রাজস্ব আদায়ের হার বিশ্বের অন্যতম কম। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য বলছে, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেন ও সুদানের সামান্য ওপরে।
সরকার প্রতি বছর যে পরিমাণ রাজস্ব আদায় করে, সেটিকে দেশের মোট অর্থনীতির আকার বা জিডিপির সঙ্গে তুলনা করে যে হার বের করা হয়, সেটিই কর-জিডিপি অনুপাত।
২০২৪ সালে বাংলাদেশের এই অনুপাত ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ। এশিয়ার দেশগুলো ও বাংলাদেশের সমমানের অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যেও এটি অন্যতম সর্বনিম্ন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই কম রাজস্ব আদায়ের কারণে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অবকাঠামো ও অন্যান্য নাগরিক সেবায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রেও সরকারের সক্ষমতা সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
কেন এত কম রাজস্ব আদায় হয়?
অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত কম থাকার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—করদাতার সংখ্যা কম হওয়া, বিশাল অনানুষ্ঠানিক খাত করের বাইরে থাকা, অতিরিক্ত কর ছাড় ও কর অবকাশ দেওয়া, কর আইন প্রয়োগে দুর্বলতা, কর ফাঁকি এবং প্রত্যক্ষ করের বদলে পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টার (আইজিসি) বলছে, দুর্নীতির কারণে সরকারি ব্যয়ের ওপর মানুষের আস্থা কমে গেছে। ফলে মানুষ কর দিতে আগ্রহ হারায়।
এছাড়া মানুষ সরকারের কাছ থেকে কী ধরনের সেবা পাচ্ছে, সেটিও কর দেওয়ার মানসিকতায় বড় প্রভাব ফেলে।
উন্নয়নে কী প্রভাব পড়ছে?
গবেষণা প্রতিষ্ঠান র্যাপিডের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক বলেন, কম রাজস্ব আদায়ের কারণে বহু বছর ধরেই সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সীমিত। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে উন্নয়নের ওপর।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বাংলাদেশের ব্যয় বিশ্বের মধ্যে অন্যতম কম। এর ফলে মানবসম্পদ উন্নয়নে প্রত্যাশিত অগ্রগতি অর্জন করা যায়নি।
অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে তিনি বলেন, কম কর আদায় একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে। কারণ মানুষ কম কর দেওয়ায় তাদের হাতে খরচ করার মতো অর্থ বেশি থেকেছে, যা বেসরকারি খাতের বিকাশে ভূমিকা রেখেছে।
অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা
প্রতিবেশী দেশ ভারতে এই কর-জিডিপি অনুপাত ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশ। পাকিস্তানে এটি ১২ দশমিক ৬৭ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ১৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অন্যদিকে ভুটানে সরকারি রাজস্বের পরিমাণ জিডিপির ২৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হতে যাওয়া দেশগুলোর মধ্যে লাওস ও নেপালের তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে বাকি দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থানই সবার নিচে।
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, সলোমন দ্বীপপুঞ্জের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ, কম্বোডিয়ায় ১৪ দশমিক ৫৮ শতাংশ এবং সেনেগালে ২০ দশমিক ১৩ শতাংশ।
আন্তর্জাতিকভাবে কর-জিডিপি অনুপাতের ন্যূনতম আদর্শ মান ধরা হয় ১৫ শতাংশ। এই হারের নিচে নামলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এই সীমার নিচে থাকলে সরকারের কার্যকারিতা, আর্থিক খাতের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যায়।
তা সত্ত্বেও ৭০টিরও বেশি উন্নয়নশীল দেশ এখনো জিডিপির ১৫ শতাংশের কম কর আদায় করে। এটি তাদের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং সরকারকে অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ফেলছে।
যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদান ও ইয়েমেনের কর-জিডিপি অনুপাত যথাক্রমে ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং ৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্য দিয়ে যাওয়া ইথিওপিয়ায় এই হার ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
এই দেশগুলো জিডিপির ১০ শতাংশের কম রাজস্ব আদায় করলেও অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, ফ্রান্স, কুয়েত ও নরওয়ের মতো বেশ কিছু দেশ ৫০ শতাংশের বেশি রাজস্ব আদায় করে।
উচ্চ কর হার ও কম রিটার্ন
ড. রাজ্জাক বলেন, বাংলাদেশের করপোরেট করের হার বিশ্বের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি। কিন্তু তারপরও সামগ্রিক রাজস্ব আদায় কম।
তিনি বলেন, শুধু রাজস্ব আদায় কম নয়, আদায়কৃত অর্থের একটি অংশও অদক্ষ ও অপচয়মূলক খাতে ব্যয় হয়। এতে সরকারি সেবার মান কমে যায়।
আইজিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চরম দুর্নীতি মানুষের মধ্যে কর ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি করে এবং কর ফাঁকি বাড়ায়।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ অপচয় হতে দেখতে চায় না। এ কারণেও অনেকে কর ফাঁকির পথ খোঁজেন।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের ডিভিশন ডিরেক্টর জঁ পেম বলেন, বাংলাদেশের কিছু করের হার সমমানের দেশগুলোর চেয়েও বেশি।
তবে তার মতে, আসল সমস্যা হলো জটিল ও ত্রুটিপূর্ণ কর ব্যবস্থা।
তিনি বলেন, দেশে ভ্যাট ও আয়করে বড় ধরনের অযৌক্তিক কর ছাড় রয়েছে। উদ্বেগের বিষয় হলো, কর ছাড়ের পরিমাণ প্রায় আদায়কৃত করের সমান। এর ফলে সরকার রাজস্ব হারায়, দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয় এবং খুব কম মানুষ ও প্রতিষ্ঠান কর দেয়।
জঁ পেম আরও বলেন, আমদানি-রপ্তানি শুল্কের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাণিজ্যকে নিরুৎসাহিত করছে। উচ্চ শুল্ক ও সম্পূরক শুল্ক রপ্তানিমুখী প্রবৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের এখন জরুরিভিত্তিতে সাহসী ও ব্যাপক কর সংস্কার প্রয়োজন। এর জন্য নীতিগত পরিবর্তনের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠন ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
পেম আরও জানান, বর্তমানের সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো কর ছাড় ও প্রণোদনা যৌক্তিক করা এবং ভ্যাট ব্যবস্থার সংস্কার করা। এছাড়া কর প্রশাসনকে আধুনিক করতে ডিজিটাল অটোমেশন বা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
সমাধানে পরামর্শ
অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাকের মতে, মূল সমস্যা করের হার নয়, বরং করের আওতা সীমিত থাকা।
তিনি বলেন, গ্রামীণ বাজার, উপশহরের শিল্প এলাকা এবং অনেক অর্থনৈতিক কার্যক্রম এখনো কর ব্যবস্থার বাইরে রয়েছে। এগুলোকে করের আওতায় আনতে হবে।
তিনি আরও বলেন, করের আওতা না বাড়ায় অর্থনীতির বড় একটি অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে রয়ে গেছে।
আয়কর ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, জমি কেনাবেচার সময় প্রায়ই প্রকৃত মূল্য কম দেখানো হয়। এতে সরকার রাজস্ব হারায়।
র্যাপিডের এক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের ১ শতাংশ মানুষের হাতে ৫০ শতাংশের বেশি সম্পদ কেন্দ্রীভূত। এতে বৈষম্য বেড়েছে।
তার মতে, শুধু সম্পদ কর নয়, এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে সম্পদ হস্তান্তরের ওপর কর আরোপের বিষয়টিও বিবেচনা করা উচিত।
তিনি পরামর্শ দেন, কর ফাঁকি কমাতে কর আদায় ব্যবস্থা অবশ্যই ডিজিটাল করতে হবে। একই সাথে পরোক্ষ করের চেয়ে সরাসরি আয়ের ওপর কর (প্রত্যক্ষ কর) আদায়ের প্রতি বেশি জোর দিতে হবে।

