রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে আটকা পড়ার পর প্রায় ১১ মাস ধরে নিখোঁজ ছিলেন গাইবান্ধার ২৭ বছরের যুবক রিমেল মিয়া। ছেলে বেঁচে আছেন কি না, তা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন ছিল পরিবার। অবশেষে গতকাল শুক্রবার দ্য ডেইলি স্টারের একটি ভিডিও সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তারা জানতে পারে, রিমেল ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক আছেন।
ইউক্রেনে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটকে থাকা তিন বাংলাদেশির একজন রিমেল। ইউক্রেনের ‘কো-অর্ডিনেশন হেডকোয়ার্টার্স ফর দ্য ট্রিটমেন্ট অব প্রিজনারস অব ওয়ার’-এর সহায়তায় ভিডিও কনফারেন্স অ্যাপ জুমে দ্য ডেইলি স্টার এই তিনজনের সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
বাকি দুজন হলেন ময়মনসিংহের ত্রিশালের সারোয়ার সুমন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের কামরুল হাসান। এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে তাদের পরিবারেরও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটেছে। তবে এখন একটাই প্রশ্ন—কীভাবে তারা দেশে ফিরবেন?
রাশিয়া গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে রিমেল
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার উত্তর মরুয়াদহ গ্রামের মো. সৈয়দ আলী ও রেখা বেগমের ছেলে রিমেল মিয়া। সৈয়দ আলী জানান, ‘খান’ নামে পরিচিত স্থানীয় এক দালালকে ৬ লাখ টাকা দিয়ে ২০২৩ সালের মার্চ মাসে রিমেল নির্মাণশ্রমিকের কাজে রাশিয়ায় যান।
এর আগে তিনি ঢাকায় প্রায় এক মাস প্রশিক্ষণ নেন। ঋণ করে এবং জমির ফসল বন্ধক রেখে পরিবার তার জন্য এই টাকা জোগাড় করে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে সৈয়দ আলী কাজ করতে পারেন না। তিনি জানান, রাশিয়ায় যাওয়ার প্রথম তিন মাসে রিমেল ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা দেশে পাঠিয়েছিলেন।
পরে রিমেল তাকে জানান, তিনি আগের কোম্পানি ছেড়ে কাজের খোঁজে মস্কোয় গেছেন।
সৈয়দ আলী বলেন, ‘সে আমার সঙ্গে দুই দিন কথা বলেছিল। তৃতীয় রাতে ফোন করে বলল, “বাবা, আমরা হয়তো দু-তিন দিন কথা বলতে পারব না, কারণ একটা সমস্যা হয়েছে।” এটা প্রায় ১০-১১ মাস আগের কথা। এরপর আর কোনো খোঁজ পাইনি।’
রিমেল রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার কথা তার পরিবারকে জানাননি। দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রিমেল জানান, কাজ হারানো এবং নিজের আইনি বৈধতা নিয়ে সমস্যায় পড়ার পর তিনি রুশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিন দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। বাঙ্কারের মতো একটি আশ্রয়ে প্রায় এক মাস কাটানোর পর ২০২৫ সালের ৮ ডিসেম্বর তিনি ইউক্রেনীয় সেনাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
ছেলের বেঁচে থাকার খবর পাওয়ার পর রিমেলের পরিবার এখন চায়, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার যেন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়।
ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে সেনাবাহিনীতে বিক্রি
ময়মনসিংহের ত্রিশালের সারোয়ার সুমন তিন সন্তানের জনক। পরিবার জানায়, প্রায় এক বছর আগে তিনি ঢাকার উত্তরার একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গ্যাস প্রকল্পের কাজের জন্য রাশিয়ায় যান। তাকে দুই বছরের চুক্তির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও প্রায় পাঁচ মাস পরই কাজ শেষ হয়ে যায়। এরপর কোম্পানি তাকে দেশে ফেরার টিকিট ধরিয়ে দেয়।
তার শ্যালক আনোয়ার হোসেন পারভেজ জানান, বিদেশে যেতে জমি বিক্রি করে এবং মাসিক সুদে ঋণ নিয়ে ১০ লাখ টাকার বেশি খরচ হয় সারোয়ারের। ঋণের বোঝা নিয়ে দেশে ফিরতে না চাওয়ায় সারোয়ার এবং আরও কয়েকজন রাশিয়াতেই কাজের খোঁজ শুরু করেন।
আনোয়ার অভিযোগ করেন, বাংলাদেশি দালালরা তাদের বারবার ধোঁকা দিয়েছে। একজন দালাল আঙুরবাগানে কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদেরকে জঙ্গলে ফেলে যায়। আরেক দালাল চাকরির লোভ দেখিয়ে রাস্তায় ফেলে যায়।
এরপর আরেকটি দালাল চক্র সারোয়ার এবং ডেইলি স্টারকে সাক্ষাৎকার নেওয়া তৃতীয় বাংলাদেশি কামরুলকে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ইতালিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেয়। পরিবার জানায়, তারা দালালকে ৫ লাখ টাকা করে অগ্রিম দিয়েছিলেন এবং বাকি টাকা ইতালিতে পৌঁছানোর পর দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইতালির বদলে এই দুজনকে রাশিয়ার সামরিক বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সাক্ষাৎকারে সারোয়ার জানান, তিনি এবং কামরুল রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে সই করেন। প্রায় ৩৫ দিনের প্রশিক্ষণ শেষে তাদের বনাঞ্চলের একটি ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়। সেখানে পাঁচ দিন কাটানোর পর গত ১৩ মে তারা ইউক্রেনীয় সেনাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেন।
গত জুনে ফেসবুকে রুশ সামরিক পোশাকে সারোয়ারের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে পরিবারের উদ্বেগ বাড়ে। এরপর সরাসরি কোনো যোগাযোগ না থাকায় আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীরা ধরে নিয়েছিলেন যে তিনি মারা গেছেন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে আরেকটি ভিডিও সামনে আসে, যেখানে তিনি ইউক্রেনে তার বন্দিজীবনের কথা জানান।
ফোনের অপেক্ষায় কামরুলের পরিবার
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার লাউর গ্রামে কামরুল হাসানের বাড়িতেও প্রতিক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না। গত মে মাসে ইউক্রেনের একটি বন্দিশিবির থেকে ভিডিও কলের মাধ্যমে তার স্ত্রী নাজমিন আক্তারের সঙ্গে তার শেষ কথা হয়।
নাজমিন বলেন, ‘সে বলেছিল তিন মাসের মধ্যে হয়তো ফিরতে পারবে। কিন্তু দুই মাসের বেশি পেরিয়ে গেলেও আর কোনো খবর পাইনি। সে কোথায় আছে বা কেমন আছে জানি না।’
নাজমিন জানান, সুইজারল্যান্ডের সাংবাদিক কার্ট পেলডার সাহায্যে ইউক্রেন থেকে কামরুলের সঙ্গে তাদের বেশ কয়েকনার কথা হয়েছিল। কিন্তু ওই সাংবাদিক ইউক্রেন ছাড়ার পর পরিবারটি আর কোনো খবর পায়নি।
পরিবারের তথ্যমতে, সিঙ্গাপুরে প্রায় ১২ বছর কাজ করার পর কামরুল বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং পরে ২০২৩ সালের ১৭ জুলাই রাশিয়ায় যান। একটি কনস্ট্রাকশন কোম্পানিতে কাজ করে মাসে ৬০০ থেকে ৭০০ ডলার আয়ের আশায় তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। এই চাকরির জন্য তার প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা খরচ হয়েছিল, যার বেশির ভাগই ছিল ঋণ করা।
সেখানে কাজ শেষ হয়ে গেলে কামরুল কাজের খোঁজে মস্কোয় যান। তার পরিবার অভিযোগ করে, দালালরা তাকে ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরও টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর তাকে জোর করে রুশ সামরিক বাহিনীর চুক্তির কাগজপত্রে সই করতে বাধ্য করে।
কামরুল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, কাগজপত্রগুলো রুশ ভাষায় লেখা ছিল এবং তিনি জানতেন না যে সেগুলো সামরিক চুক্তি। দালালকে টাকা দেওয়ার পর তার মনে হয়েছিল যে ওই কাগজে সই করা ছাড়া তার আর কোনো উপায় নেই।
নাজমিন বলেন, ‘পাওনাদাররা টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে। কিন্তু আমার সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো, আমার স্বামী আর কখনো বাড়ি ফিরতে পারবে কি না!’

