জলবায়ু বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীদের একাংশ সিদ্ধান্তে পৌঁছে গিয়েছিলেন—প্রাকৃতিক উষ্ণায়ন প্রক্রিয়া এল নিনো তার কার্যকারিতা হারিয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব আর প্রকৃতিতে দেখা যাবে না। তবে সেই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়েছে ২০২৪ সালে।
বাংলাদেশেও সেই ঢেউ আছড়ে পড়েছিল। আবহাওয়া অধিদপ্তর ওই বছর টানা ৩৬ দিন তাপপ্রবাহ রেকর্ড করে। ওই ৩৬ দিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ছিল।
আবারও আশঙ্কা করা হচ্ছে, জুলাই-আগস্টের মধ্যেই এল নিনো সক্রিয় হবে এবং কম্পিউটার মডেলগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, এটি হতে পারে সুপার এল নিনো। তবে এর প্রভাব শুরু হতে পারে আরও আগে থেকেই।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসন (এনওএএ) জানিয়েছে, এই সম্ভাবনা এক-চতুর্থাংশ।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈশ্বিক উষ্ণতা পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, বৈশ্বিক সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। সমুদ্রপৃষ্ঠ উষ্ণ হয়ে উঠলে এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়।
কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস সম্প্রতি জানিয়েছে, মার্চেই সমুদ্রের তাপমাত্রা প্রায় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে।
সংস্থাটি বলছে, ২০২৪ সালের মার্চে সমুদ্র সবচেয়ে বেশি উষ্ণ ছিল। সে সময় এল নিনো জলবায়ু চক্র তাপমাত্রা বাড়িয়েছিল। বিভিন্ন সূচক বলছে, আবারও ‘এল নিনো পরিস্থিতির দিকে সম্ভাব্য রূপান্তর আসন্ন।’
গত মাসে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জলবায়ু চক্র পরিবর্তনের পূর্বাভাসে জানায়, শীতল লা নিনা চক্র ধীরে ধীরে নিরপেক্ষ অবস্থায় যাবে এবং চলতি বছরের শেষ দিকে এল নিনোতে রূপ নেবে।
আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম তাপমাত্রা রেকর্ড করা শুরু হয় ১৮৫০ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি আবহাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৩২ বছরের মধ্যে অস্বাভাবিকভাবে সবচেয়ে উষ্ণ মাস ছিল মার্চ।
অলাভজনক সংস্থা ক্লাইমেট সেন্ট্রালের আবহাওয়াবিদ শেল উইংকলির বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে, ‘এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার একটি বড় কারণ হলো, রেকর্ডের বিপুল সংখ্যা। এর আগে ছিল সবচেয়ে খারাপ তুষারপাতের বছর এবং রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ শীতকাল।’
ক্লাইমেট সেন্ট্রালের হিসাবে, ২০ ও ২১ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এলাকায় এমন অস্বাভাবিক গরম অনুভূত হয়, যা মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন ছাড়া প্রায় অসম্ভব ছিল।
প্রসঙ্গত, ২০১৫ সালে প্যারিস চুক্তির ধারাবাহিকতায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলো পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার ব্যাপারে সম্মত হয়েছিল। সে সময় বৈশ্বিক উষ্ণতার সবচেয়ে খারাপ প্রভাব এড়াতে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়।
তবে কোপার্নিকাসের তথ্যে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিল্পপূর্ব যুগের তুলনায় বৈশ্বিক পৃষ্ঠতলের তাপমাত্রা ১ দশমিক ৩ থেকে ১ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বেড়েছে।
লা নিনা ও এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের বিপরীতধর্মী জলবায়ু চক্র। লা নিনা সক্রিয় থাকলে অতি শক্তিশালী আয়ন বায়ুর কারণে প্রশান্ত মহাসাগরের পানির উচ্চতা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। তখন পেরুভিয়ান-তীরবর্তী সমুদ্রের পানি বেশি ঠান্ডা হয়।
অন্যদিকে দক্ষিণ গোলার্ধের আবহাওয়ার স্বাভাবিক গতির পরিবর্তনে এল নিনো সক্রিয় হয়। ফলে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে (বিশেষ করে পেরু) জলভাগ উষ্ণ হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা এখনো এল নিনোর বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করছেন।
গত মার্চে আর্কটিক অঞ্চলে সমুদ্রের বরফের বিস্তার গড়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৭ শতাংশ কম ছিল, যা ওই মাসের জন্য সর্বনিম্ন রেকর্ড বলে জানিয়েছে কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস।
সমুদ্র পৃথিবীর তাপাধার হিসেবে কাজ করে। মানবসৃষ্ট অতিরিক্ত তাপের বেশিরভাগই এটি শোষণ করে বৈশ্বিক জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাপ বাড়লে সমুদ্রের আয়তন বৃদ্ধি পায় এবং আর্কটিক অঞ্চলের বরফ দ্রুত গলে যাওয়ায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যায়। এছাড়া, সমুদ্র উষ্ণ হলে শক্তিশালী ঝড় ও বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বাড়ে।
পূর্ব দিকে না গিয়ে পূবালি বাতাস পশ্চিমে বয়ে গেলে সমুদ্রস্রোতও সেদিকে যায়। এতে পশ্চিম দিকে বৃষ্টি বাড়লেও বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমার অঞ্চলে বৃষ্টি কমে যায়। ফলে তাপমাত্রা বেড়ে খরাও দেখা দেয়। আরও অনেক কারণেও খরা হতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) পূর্বাভাস ও বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি বছরের মার্চ-মে সময়ে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য-পূর্ব অংশে এনসো-নিরপেক্ষ অবস্থার সম্ভাবনা ৬০ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে, জুলাই মাসের শেষে কিংবা আগস্টের শুরুতে এল নিনো সক্রিয় হতে পারে।
যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ মো. তরিফুল নেওয়াজ কবির দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ধারণা করা হচ্ছে, এল নিনো সক্রিয় হতে পারে মুনসুনের মাঝামাঝিতে কিংবা আরও পরে—অর্থাৎ বর্ষার শেষে।’
‘ফলে আমরা ধরে নিতে পারি, বর্ষায় স্বাভাবিক বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে,’ বলেন তিনি।
আরেক আবহাওয়াবিদ কামরুল হাসান বলেন, ‘অস্ট্রেলিয়া-ইন্দোনেশিয়ার বড় অঞ্চলজুড়ে এল নিনো বা লা নিনার প্রভাবে দেখা যায়। সব সময় আমাদের দেশে এর প্রভাব অত বেশি স্পষ্ট হয় না, তবে ২০২৪ সালে খুব ভালোভাবে দেখা গিয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে এবং অন্যান্য সূচক থেকে ধরে নেওয়া যায়, লা নিনা নিরপেক্ষ অবস্থা থেকে এল নিনোর দিকে যাবে। এর প্রভাব সুস্পষ্টভাবে বলতে হলে আরও অপেক্ষা করতে হবে। এখন পর্যন্ত ধারণা করা যায়, জুলাই পর্যন্ত নিরপেক্ষ অবস্থাই থাকতে পারে।’
আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ বলেন, ‘এল নিনো এবং লা নিনা বৈশ্বিক আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশে এর সরাসরি প্রভাব না থাকলেও বৈশ্বিকভাবে প্রভাব পড়তে দেখা যায়।’
‘মে-জুন মাসে যদি এল নিনো শক্তিশালী হতে শুরু করে, তাহলে বৃষ্টিপাতের প্যাটার্ন প্রভাবিত হবে। মৌসুমি তাপমাত্রা বেড়ে যেতে পারে। ফলে ঘন ঘন তাপপ্রবাহ আসবে,’ বলেন তিনি।
এই আবহাওয়াবিদ আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা বৈশ্বিক প্রভাব দেখছি। বর্ষা দেরিতে আসছে, রেইন স্কেল কমে যাচ্ছে।’
এল নিনো ঠিক কত দিন স্থায়ী হবে, তা বলা কঠিন। তবে সাধারণত এটি ২ থেকে ৩ মাস সক্রিয় থাকে। কখনো কখনো ৬ মাস, এমনকি ১০ মাস পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে এর প্রভাব।

