এমবাপে: লুসাইলের নিঃসঙ্গ নায়ক

তিনটি গোল। তিনটি। একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে। এবং তবুও হার।

কেউ যদি এই বাক্যটি কোনো উপন্যাসে পড়তেন, হয়তো বলতেন, লেখক বাড়াবাড়ি করছেন। বাস্তব এতটা নিষ্ঠুর হয় না। কিন্তু ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, কাতারের লুসাইল স্টেডিয়াম প্রমাণ করে দিয়েছিল, বাস্তব কখনো কখনো কল্পনার চেয়েও বেশি নির্মম।

কিলিয়ান এমবাপে সেদিন যা করেছিলেন, তা ইতিহাসের পাতায় সোনার হরফে লেখার মতো। আবার একই সঙ্গে, সেটি এমন এক ক্ষত যা শুকায় না সহজে।

ম্যাচের প্রথমার্ধ ছিল ফ্রান্সের জন্য দুঃস্বপ্ন। আর্জেন্টিনা যেন খেলছিল না, উড়ছিল। লিওনেল মেসি একটি পেনাল্টি ধাক্কা দিয়ে স্কোরবোর্ড খুললেন। তারপর দি মারিয়ার এক অবিশ্বাস্য গোল, ৩৬ বছর বয়সে একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে চিপ শট, যেন চিত্রশিল্পীর তুলির শেষ আঁচড়। দুই গোলে এগিয়ে আর্জেন্টিনা। স্টেডিয়ামের আলো নীল-সাদায় ছেয়ে গেছে। ফরাসি সমর্থকরা নীরব, অবাক, বিধ্বস্ত।

ডাগআউটে দিদিয়ে দেশঁম কপালে হাত ঠেকিয়ে বসে আছেন। কিছু পরিবর্তন আনলেন। কিন্তু কী করবেন? যেন পুরো দলের পা থেকে শক্তি চুষে নিয়েছে কেউ।

এমবাপে? তিনি ছিলেন। মাঠে ছিলেন। কিন্তু যেন অদৃশ্য। আর্জেন্টিনার রক্ষণ তাকে কোণায় ঠেলে দিচ্ছিল বারবার। নিকোলাস ওতামেন্দি, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো দুজনেই যেন তার পায়ের কাছে ছায়ার মতো। ৮০ মিনিট পর্যন্ত সেই ম্যাচটা ছিল আর্জেন্টিনার একক আধিপত্যে।

তারপর পৃথিবী থমকে গেল।

৮০তম মিনিট। কোলো মুয়ানিকে পেনাল্টি বক্সে ফাউল করা হলো। রেফারি সন্দেহ করলেন না। পেনাল্টি।

এমবাপে এগিয়ে এলেন। বল রাখলেন স্পটে। এমিলিয়ানো মার্তিনেসের দিকে তাকালেন। সেই চাউনিতে না ছিল ভয়, না ছিল আড়ষ্টতা। এমন একজন মানুষের চোখ, যিনি জানেন তিনি কী করতে পারেন।

বল ঢুকল জালে।

ফ্রান্সের সমর্থকরা আলো দেখতে শুরু করলেন। কিন্তু ততক্ষণে ৮০ মিনিট শেষ হয়ে গেছে। মাত্র দশ মিনিট বাকি। দুই গোলের ব্যবধান কমিয়ে একে আনলেন এমবাপে। কিন্তু একটা গোল দিয়ে কী হবে?

হবে। যা হওয়ার তা হবে।

৯৭ সেকেন্ড পেরিয়েছে। আক্ষরিক অর্থে পরের মিনিটেই। মার্কাস থুরাম একটা ক্রস দিলেন বাম দিক থেকে। এমবাপে বক্সের ভেতরে। বল পেলেন। বাঁ পা তুললেন। একটা ভলি। যে ভলি শুধু সেই মানুষটাই মারতে পারেন, যার পায়ে প্রকৃতি কিছু অতিরিক্ত দিয়ে পাঠিয়েছে।

২-২।

লুসাইল স্টেডিয়াম স্তব্ধ হয়ে গেল এক সেকেন্ডের জন্য। তারপর ভেঙে পড়ল উন্মাদনায়।

যে ম্যাচ মৃত মনে হয়েছিল, সে হঠাৎ লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। নব্বই মিনিটে সমতা। অতিরিক্ত সময়।

কিছুক্ষণ আগেও যে স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার উৎসব শুরু হয়ে গিয়েছিল, সেখানে নেমে এল এক অদ্ভুত নীরবতা। ফরাসি সমর্থকেরা উন্মাদনায় চিৎকার করছে, আর আর্জেন্টাইনদের চোখে হঠাৎ ভয়ের ছায়া।

একজন মানুষ, মাত্র দুই মিনিটে, ইতিহাসের চেহারা বদলে দিয়েছেন।

অতিরিক্ত সময়ে আবারও সামনে আসে আর্জেন্টিনা। মেসির গোল, ৩-২। মনে হচ্ছিল, এবার আর ফেরার পথ নেই। যেন নিয়তি শেষমেশ নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু এমবাপে যেন হার মানতে রাজি নন।

ফরাসি আক্রমণ, শট, ডিফেন্ডারের হাতে বল লাগে। আবার পেনাল্টি।

স্টেডিয়াম নিস্তব্ধ।

এমবাপে আবার এগিয়ে এলেন। স্পটে বল রাখলেন। আবার সেই চোখ। সেই নিস্পৃহ ভঙ্গি।

৩-৩।

হ্যাটট্রিক।

বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে, সবচেয়ে বড় চাপের মুহূর্তে।

ইতিহাসের পাতায় এমন ঘটনা বিরল। ১৯৬৬ সালে জিওফ হার্স্টের পর আর কেউ পারেননি। এমবাপে শুধু করলেনই না, তিনি এমনভাবে করলেন যেন একা কাঁধে পুরো জাতির স্বপ্ন বহন করছেন।

অথচ পরিহাসটা ছিল ভয়াবহ।

পেনাল্টি শুটআউট।

ফুটবলের সবচেয়ে নিষ্ঠুর বিচারপদ্ধতি। দশ গজ দূর থেকে একজন মানুষ একা। গোলকিপার একা। এবং বাকি বিশ কোটি মানুষ নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে।

এমিলিয়ানো সেদিন অলৌকিক ছিলেন। কিন্সলে কোমানের শট ঠেকালেন। আউরেলিয়েন চুয়ামেনির শট পোস্টে লেগে বাইরে। আর্জেন্টিনা জিতল ৪-২ পেনাল্টিতে।

মেসি মাঠে লুটিয়ে পড়লেন। তার চোখে জল। ৩৫ বছরের অপেক্ষার শেষে স্বর্গ পেলেন তিনি।

এমবাপে দাঁড়িয়ে রইলেন। মাথা নিচু নয়, তবু কোথাও একটা অসহায়ত্ব। তার চারপাশে আর্জেন্টিনার উৎসব। নীল-সাদার বন্যা। তিনি একা, নীল-সাদার সমুদ্রের মাঝে লাল-নীল একটি দ্বীপ।
তিনি তিনটি গোল করেছেন। বিশ্বকাপ ফাইনালে। এবং তবুও তার হাতে কাপ নেই।

এই যন্ত্রণার কোনো নাম নেই।

ক্রীড়া ইতিহাসে এরকম মুহূর্ত বিরল, যেখানে একজন মানুষ অসাধারণ কিছু করেন, এবং সেটাও যথেষ্ট হয় না। এমবাপের সেই রাতটা ছিল ঠিক সেরকম। গোল তিনটি। মোট ব্যবধান কমিয়ে আনা। দলকে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে আনা একাই। এবং শেষমেশ পেনাল্টি স্পটে দাঁড়িয়ে বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত চাপ নিয়ে নিখুঁত শট মারা।

কিন্তু সতীর্থরা পারলেন না। এবং সেটা এমবাপের গোলের হিসাবে ধরা নেই।

ফুটবল এখানেই নিষ্ঠুর। এটা একার খেলা না। এমবাপে যা করলেন, তা একার পক্ষে করার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে যাওয়া। তবু দলের বাকিদের ব্যর্থতার দায় তার ঘাড়ে এসে পড়ে, কারণ বাক্সের বাইরে লেখা থাকে শুধু, ‘চ্যাম্পিয়ন’ অথবা ‘রানার্স আপ’।

ম্যাচের পর মেসিকে ঘিরে ধরলেন হাজারো মানুষ। সেই ছবি পৃথিবীর সামনে আনন্দের ছবি হয়ে গেল। আর এমবাপে? লকার রুমে ফিরে গেলেন। ক্যামেরায় ধরা পড়া তার শেষ মুহূর্তের ছবিটায় দেখা যাচ্ছিল, ট্রফি বিতরণের মঞ্চে উঠলেন, রানার্স আপ মেডেলটা গলায় পড়লেন, তারপর সেটা সরিয়ে নামিয়ে ফেললেন। মেডেল গলায় রাখতে পারেননি।

সেই এক মুহূর্তেই বলা হয়ে গিয়েছিল সব।

রুপার মেডেল তার কাছে হয়তো অপমান মনে হয়েছিল সেদিন। তিন গোল করেও যখন ট্রফি ওঠে না হাতে, তখন মেডেল আর কী অর্থ বহন করে?
 

Related Articles

Latest Posts