একই সংলাপ বারবার বলছেন একজন, অন্যজন একবার মহড়া দিয়েই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে যাচ্ছেন। ‘পিকু’র সেটে অমিতাভ বচ্চন ও ইরফান খানের কাজের এই পার্থক্য লক্ষ করেছিলেন পরিচালক সুজিত সরকার। দুই অভিনেতার প্রস্তুতির ধরন আলাদা হলেও লক্ষ্য ছিল এক—চরিত্রকে পর্দায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা।
‘পিকু’র একটি দৃশ্যে ইরফানের চরিত্র রানা ড্রাইভিং লাইসেন্স তুলে দিচ্ছেন অমিতাভের চরিত্র ভাস্কর ব্যানার্জির হাতে। অমিতাভ সকাল থেকেই দৃশ্যটির মহড়া দিচ্ছিলেন। শুটিং শুরু হয় বিকেল চারটায়। অন্যদিকে, ইরফান একবার মহড়া দিয়েই ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। প্রথম টেকের পর আরেকটি টেক নিতে চাইলে অমিতাভ তাকে প্রশ্ন করেন, মহড়ার সময় বাঁ হাতে লাইসেন্স দিলেও ক্যামেরার সামনে ডান হাত ব্যবহার করলেন কেন?

দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ঘটনাটি জানান সুজিত সরকার। তার মতে, ফিল্ম রোলের যুগে বারবার টেক দেওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় অমিতাভ দীর্ঘ সময় প্রস্তুতি নিতেন, যেন ক্যামেরার সামনে দৃশ্যটি নিখুঁতভাবে তুলে ধরা যায়। তবে এই প্রস্তুতি কেবল সময় বাঁচানোর জন্য নয়; অভিনয়ের প্রতিটি খুঁটিনাটির প্রতিও তার মনোযোগ থেকে করতেন।
এনডিটিভিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অমিতাভ জানান, ‘দিওয়ার’ সিনেমার একটি দৃশ্য নিয়ে তিনি এতটাই দ্বিধায় ছিলেন যে, প্রস্তুতি নিতে মেকআপ রুমেই থেকে যান। পরিচালক যশ চোপড়া তাকে নিজের মতো করে প্রস্তুতি নেওয়ার সময় দিয়েছিলেন। অমিতাভের বর্ণনা অনুযায়ী, রাত ১০টা বা ১১টার দিকে তিনি দৃশ্যটির জন্য প্রস্তুত বলে মনস্থির করেন।

অভিনেতার মতে, একা মহড়া দেওয়া আর ক্যামেরা ও শুটিং ইউনিটের সামনে অভিনয় করা এক নয়। তাই কখনো কখনো তিনি সেট থেকে সবাইকে সরে যেতে বলেন, যেন দৃশ্যটিতে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারেন। চরিত্রের আবেগ ও পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার এই চেষ্টাই তার প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
২০২১ সালে ‘চেহরে’ সিনেমার প্রচারের সময় প্রযোজক আনন্দ পণ্ডিতের সঙ্গে আলোচনায় নিজের মহড়ার অভ্যাস নিয়ে কথা বলেন অমিতাভ। জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে সংলাপ মনে রাখতে তাকে আরও বেশি অনুশীলন করতে হয়। নিজের কাজ ঠিকভাবে করাকে তিনি নির্মাতাদের প্রতি দায়িত্ব বলে মনে করেন। একটি সিনেমা তৈরিতে অনেক মানুষ পরিশ্রম করেন; অভিনেতা হিসেবে নিজের অংশটুকু যথাযথভাবে করাই তার কর্তব্য বলে মনে করেন বিগ বচ্চন।

২০১৮ সালে নিজের ব্লগেও চলচ্চিত্র নির্মাণের খুঁটিনাটি নিয়ে লিখেছিলেন অমিতাভ। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংলাপের পাশাপাশি অভিনেতাকে খেয়াল রাখতে হয় চলাফেরা, হাত-পায়ের অবস্থান, মেকআপ, চুলের বিন্যাস ও ক্যামেরার সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়গুলো। এক টেকের সঙ্গে পরের টেকের সামান্য অমিলও দৃশ্যের ধারাবাহিকতা নষ্ট করতে পারে।
অমিতাভের প্রস্তুতির কথা বলতে গিয়ে আমির খান স্মরণ করেছিলেন নিজের প্রথম সিনেমা ‘কয়ামত সে কয়ামত তক’-এর শুটিংয়ের সময়ের একটি ঘটনা। পাশের সেটে একই সংলাপ বারবার বলতে শুনে কৌতূহল নিয়ে দেখতে যান তিনি। গিয়ে দেখেন, অভিনেতাটি অমিতাভ বচ্চন। আমিরের ধারণা হয়েছিল, সংলাপটি ১০০ থেকে ২০০ বার বলা হয়েছে। আটটি টেক দেওয়ার পরও নিজের অভিনয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না অমিতাভ। আমিরের কাছে ঘটনাটি ছিল অভিনয়ের প্রতি তার নিষ্ঠার অসাধারণ উদাহরণ।

‘পা’ সিনেমায় অরোর চরিত্রে অভিনয়ের জন্যও দীর্ঘ সময় মেকআপ নিতে হতো তাকে। ৬৭ বছর বয়সে এমন শারীরিক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে চরিত্রটিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা ছিল বড় চ্যালেঞ্জ।
‘দিওয়ার’, ‘জঞ্জির’ ও ‘শোলে’ থেকে ‘পিকু’ কিংবা ‘কল্কি ২৮৯৮ এডি’—দীর্ঘ অভিনয়জীবনে অমিতাভ বারবার নিজেকে বদলেছেন চরিত্রের প্রয়োজনে। সময় বদলেছে, চরিত্র বদলেছে, কিন্তু প্রস্তুতির প্রতি নিষ্ঠা রয়ে গেছে একই। তার কাছে অভিনয় কেবল সংলাপ বলা নয়, চরিত্র হয়ে ওঠা।
তথ্যসূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ, এনডিটিভি, দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এবং সংশ্লিষ্ট ভিডিও।

