উৎসবের দিনেও যখন ডিউটিই সব

ঈদের সকাল কীভাবে কাটবে, তা আগে থেকেই জানেন ৫০ বছর বয়সী নিরাপত্তাকর্মী মোহাম্মদ বেলাল।

বগুড়ার গ্রামের বাড়িতে ঈদের নামাজ পড়া কিংবা পরিবারের সবাইকে নিয়ে ঈদের খাবার খাবেন না তিনি। অন্যান্যবারের মতো এবারও তাকে পাওয়া যাবে মোহাম্মদপুরের কাটাসুরে অবস্থিত কাদেরাবাদ হাউজিংয়ের এনএন টাওয়ারের গেটে। 

গত আট বছর ধরে এ ভবনেই নিরাপত্তাকর্মীর কাজ করছেন তিনি। 

‘ঈদের দিন কাজ করলে অতিরিক্ত টাকা পাই, সঙ্গে মাংসও। ঈদের দিন মালিকসহ অনেকেই আমাদের মাংস দেন। পরদিন পরিচিত কারও মাধ্যমে সেই মাংস গ্রামে পাঠাই। না হলে বাস কাউন্টারে গিয়ে বাসে পাঠিয়ে দেই,’ বলেন বেলাল।

ঢাকায় ঈদের ব্যস্ততা শেষ হলে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার নশরতপুর ইউনিয়নের শাওইল গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘১ জুন থেকে ছুটি নিয়েছি। কয়েকদিন পরিবারের সঙ্গে কাটাব। পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে পারলে আনন্দ লাগত। কিন্তু এখন আমি ঈদের পর ঈদ করি।’

বেলালের মতো রাজধানীজুড়ে অনেক নিরাপত্তাকর্মীর কাছে প্রায় প্রতিবারই ঈদ আসে দেরিতে।

বাসিন্দারা যখন কোরবানির প্রস্তুতি নেন, তখন নিরাপত্তাকর্মীরা থেকে যান অ্যাপার্টমেন্ট ও অফিস ভবনে। তারা খালি ফ্ল্যাট পাহারা দেন, গেট সামলান, আগতদের তদারকি করেন, কোরবানির পশু আনা-নেওয়ায় সহায়তা করেন, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করেন এবং পুরো দিনজুড়ে বাসিন্দাদের সেবা দেওয়ায় ব্যস্ত থাকেন।

ঈদের দিনে কসাই, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, অতিথি ও মাংস বহনকারীদের যাতায়াত বাড়ায় তাদের কাজের চাপও বেড়ে যায়।

এই নিরাপত্তাকর্মীদের অনেকেই ঢাকার বাইরে থেকে এসেছেন—কুমিল্লা, রংপুর, বরিশাল, জামালপুর, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলা থেকে।

নিরাপত্তাকর্মীরা বলেন, তাদের বেশিরভাগই ঈদে বাড়ি যেতে চান, কিন্তু দায়িত্বের কারণে তা প্রায়ই সম্ভব হয় না।

বেলাল জানান, কোনো নিরাপত্তাকর্মী ছুটি পাবেন কি না, তা অনেকটাই নির্ভর করে একটি ভবনে কতজন গার্ড কাজ করেন তার ওপর।

‘যে ভবনে তিন-চারজন গার্ড আছে, সেখানে কেউ কেউ ঈদে বাড়ি যেতে পারেন। কিন্তু যেখানে একজন গার্ড, তাকে ঢাকাতেই ঈদের দিন কাটাতে হয়,’ বলেন তিনি।

ইস্কাটন গার্ডেন রোডের নিরাপত্তাকর্মী আফজাল মিয়ার জন্য ঈদের দিন শুরু হয় খুব ভোরে। ঈদের নামাজ শেষে সরাসরি কাজে ফিরতে হয় তাকে।

বাসিন্দাদের কোরবানির পশু আনা-নেওয়া, পানির ব্যবস্থা, গেট খোলা-বন্ধ, ভবনের ভেতরের যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও মাংস বিতরণের কাজে সহায়তা করেন তিনি।

‘ঈদের দিন সবাই ব্যস্ত থাকে। কেউ গরু আনে, কেউ কসাই খোঁজে, কেউ মাংস নেওয়ার লোক পাঠায়। আমাদের সবসময় গেটে থাকতে হয়। এক মুহূর্তের জন্য অসতর্ক হওয়ার সুযোগ থাকে না,’ বলেন আফজাল।

মহাখালীর আরেক নিরাপত্তাকর্মী দিদার হোসেন জানান, ঈদের সময় ঢাকায় থাকলে কিছু আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, ‘ঈদের সময় কাজ করলে কোরবানির মাংস পাই। কেউ কেউ টাকাও দেন। কিন্তু পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার আনন্দই আলাদা।’

নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, কিছু ভবনের বাসিন্দারা তাদের পরিবারের খোঁজ নেন, খাবার ও মাংস দেন, ঈদ বোনাসও দেন। আবার কেউ কেউ বলেন, অতিরিক্ত কাজের বদলে তেমন কিছুই পান না।

ঈদের সময় নিরাপত্তাকর্মীদের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় উল্লেখ করে লালমাটিয়ার ফ্ল্যাট মালিক সালাম রহমান বলেন, ‘অনেক বাসিন্দা ঢাকার বাইরে থাকেন। যারা ঢাকায় থাকেন, তাদেরও কোরবানিসংক্রান্ত কাজে সহায়তা লাগে। তাই সবাইকে একসঙ্গে ছুটি দেওয়া সম্ভব নয়।’

ঢাকার নিরাপত্তাকর্মীদের ঈদ আসে দুই ভাগে। প্রথম অংশ কাটে ঢাকায় কাজ করতে করতে, যখন অন্যরা ঈদের আনন্দে মাতেন। আর দ্বিতীয় অংশ শুরু হয় যখন তারা অবশেষে বাড়ি ফিরতে পারেন।

বেলাল ও দিদার দুজনই বলেন, সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত আসে ঈদের দিনেই।

‘বাড়ি থেকে ফোন আসে। সন্তানরা জিজ্ঞেস করে বাবা কবে আসবে। স্ত্রী জিজ্ঞেস করে, আবার কি সন্তান বাবাকে ছাড়া ঈদের খাবার খাবে?’

অবশ্য এই ত্যাগের কষ্ট কখনো কমে যায় বাসিন্দাদের একটু সদয় আচরণে।

ট্যানারী মোড়ের নিরাপত্তাকর্মী কাউসার হোসেন বলেন, ‘যখন বাসিন্দারা বলেন, “ভাই, আপনি আছেন বলেই আমরা নিশ্চিন্তে বাড়ি যেতে পারছি,” তখন ভালো লাগে। কষ্টটা একটু কমে যায়।’ 

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফেরদৌস হাসান প্রান্ত জানান, ঈদ ভিন্ন মানুষের কাছে ভিন্ন অর্থ বহন করে।

‘বাসিন্দাদের জন্য ঈদের মানে ভ্রমণ, পুনর্মিলন আর কোরবানি। কিন্তু গার্ডদের জন্য এই দিনটি অপেক্ষারও।’

ঢাকার নিরাপত্তাকর্মীদের ঈদ শুরু হয় তখনই, যখন অন্যদের ঈদ আর তাদের ডিউটি শেষ হয়।

Related Articles

Latest Posts