উপাচার্য নিয়োগ: আইন কী বলে, বাস্তবে কতটা মানা হচ্ছে

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উপাচার্য বা ভাইস-চ্যান্সেলর (ভিসি) পদটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্বগুলোর একটি। তিনি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী নন; শিক্ষা, গবেষণা, অবকাঠামো উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং একটি প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রেও নেতৃত্ব দেন।

তবে বাংলাদেশে পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে এখনো কোনো অভিন্ন ও বাধ্যতামূলক নীতিমালা নেই। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে উপাচার্য নিয়োগের যোগ্যতা ও প্রক্রিয়ায় কিছু পার্থক্য আছে। 

সম্প্রতি দেশের কয়েকটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। যেমন সম্প্রতি সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-হাদীস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মো. জাকির হুসাইন।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (মাভাবিপ্রবি) উপাচার্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক এবিএম শহিদুল ইসলামকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক গোলাম রব্বানী।

প্রশ্ন উঠেছে—উপাচার্য নিয়োগের ক্ষেত্রে আইনে কী বলা আছে? একজন ভিসি হওয়ার জন্য কী ধরনের যোগ্যতা প্রয়োজন? আর বাস্তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ?

বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের মূল আইনি ভিত্তি হলো সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন বা অধ্যাদেশ। এসব আইনে বলা থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি উপাচার্য নিয়োগ করবেন। 

তবে সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ প্রক্রিয়া এক নয়।

দেশের চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশ অনুযায়ী। এসব আইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের ভূমিকা রয়েছে। সিনেট উপাচার্য পদের জন্য তিনজন যোগ্য শিক্ষাবিদের একটি প্যানেল সুপারিশ করে এবং সেখান থেকে রাষ্ট্রপতি একজনকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেন।

তবে বর্তমানে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে সিনেটের মাধ্যমে প্যানেল তৈরির প্রক্রিয়া অনেক সময় কার্যকর থাকে না বলে অভিযোগ আছে। ফলে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অন্যদিকে, দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সিনেটের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের ব্যবস্থা নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে সাধারণত শিক্ষা মন্ত্রণালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আলোচনার ভিত্তিতে প্রার্থীর নাম রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো হয়। অনুমোদনের পর রাষ্ট্রপতির নামে নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি হয়।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে উপাচার্য নিয়োগের বিধান রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এর ৩১ ধারায়। 

যোগ্যতার বিচারে সাধারণ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইনে মূলত ‘স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ’ হওয়ার কথা উল্লেখ থাকে। 

তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি কিংবা অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে আইনি শর্ত বেশ স্পষ্ট। সেখানে বলা থাকে যে প্রার্থীকে অবশ্যই ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি’ বা সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের ‘স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ’ বা ‘বিশেষজ্ঞ’ হতে হবে। 

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০১-এর ১০(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিকে’ উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। একই শব্দগুলো বলা আছে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০০১-এর ১০(১) এবং সুনামগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০২০-এর ১০(১) ধারায়।

কারণ এসব প্রতিষ্ঠানে গবেষণাগার পরিচালনা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতার মতো বিশেষায়িত কাজের জন্য সংশ্লিষ্ট খাতের বাস্তব অভিজ্ঞতা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সংক্রান্ত যেসব বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতের বিশেষজ্ঞ বা সংশ্লিষ্ট মানুষই আসবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

ইউজিসির সাবেক সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আইন কোনো সমস্যা না আসলে, আইন যা আছে তা যথেষ্ট ভালোই আছে। তবে সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির ক্ষেত্রে বলা আছে স্ব স্ব ক্ষেত্রে দক্ষ হতে হবে। কিন্তু আমরা দেখছি সরকার নিজেই এই আইনগুলোকে তৈরি করে আবার নিজেই তা বিবেচনায় নিচ্ছে না।’

আইনগত শর্তের পাশাপাশি একজন আদর্শ উপাচার্যের উচ্চমানের গবেষণা, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, বিভাগীয় প্রধান বা ডিনের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি ‘একাডেমিক লিডারশিপ’, আর্থিক দক্ষতা ও ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ ক্ষমতা থাকা দরকার। কিন্তু বাস্তবে প্রার্থীর প্রাতিষ্ঠানিক ভিশন পর্যালোচনা করা হয় না উল্লেখ করে তানজীমউদ্দিন বলেন, ‘এখন যে ভিসি নিয়োগ করা হয়, তাকে কখনো জিজ্ঞেস করা হয় না দায়িত্ব নেওয়ার পর চার বছরে বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে তার পরিকল্পনা কী। যার ফলে যোগ্যতার প্রধান বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয় না।’

পাবলিকের পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ পরিচালিত হয় ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০’-এর ৩১ নম্বর ধারা অনুযায়ী। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড যোগ্য প্রার্থীদের নাম শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে চ্যান্সেলরের কাছে পাঠায়। ইউজিসির মতামত সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতি (চ্যান্সেলর বা আচার্য) যেকোনো একজনকে চার বছরের জন্য নিয়োগ দেন। 

৩১ ধারা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য (রাষ্ট্রপতি) প্রথম শ্রেণি বা সমমানের স্নাতক স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অথবা পিএইচডি ডিগ্রিধারীকে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেবেন। স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ে তার শিক্ষকতায় ন্যূনতম ১০ বছরের এবং গবেষণা ও প্রশাসনিক কাজে মোট ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগে স্বচ্ছতা আনতে ২০২৫ সালের ১৮ মে সরকার একটি সার্চ কমিটি গঠন করেছিল। তবে পরবর্তীতে এই কমিটির গঠনপ্রণালী ও কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে এবং বর্তমানে এটি প্রায় নিষ্ক্রিয়।

এই কমিটির তৎকালীন সদস্য ছিলেন অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান। তার ভাষ্য, ‘সংকটের মূল জায়গাটা হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে যোগ্যতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। পলিটিক্যাল পার্টিগুলো তাদের লোকজনকে দায়িত্বে আনার জন্য তদবির করেছে।’

তার মতে, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দলীয় আনুগত্য বা অনুগত ব্যক্তি খোঁজার প্রবণতা, ব্যক্তিগত তদবির ও যোগাযোগের কারণে যোগ্য ব্যক্তিরা বঞ্চিত হন এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো তার স্বাধীনতা হারায়।

সর্বশেষ চলতি বছরের ২ এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের জন্য প্রার্থী বাছাইয়ের লক্ষ্যে ৬ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি পুনর্গঠন করে।

তবে এই কমিটি নিয়েও বিতর্ক আছে। কমিটির শিক্ষক সদস্যদের অধিকাংশেরই বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন ‘সাদা দল’ এবং ‘জিয়া পরিষদ’-এর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা রয়েছে।

অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’-এর সাবেক আহ্বায়ক ছিলেন। এছাড়া তিনি বিএনপির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক এবং বিএনপিপন্থী শিক্ষক সংগঠন ‘ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ইউট্যাব)’-এর সভাপতির দায়িত্বেও রয়েছেন।

অধ্যাপক মো. ফরিদুল ইসলাম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয়তাবাদী আদর্শের শিক্ষক সংগঠন ‘জিয়া পরিষদ’-এর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন।

অধ্যাপক মো. মোর্শেদ হাসান খান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ‘সাদা দল’-এর আহ্বায়ক। পাশাপাশি তিনি বিএনপির গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক এবং ইউট্যাবের মহাসচিবের দায়িত্বে যুক্ত।

ফলে উপাচার্য পদে শিক্ষক মনোনয়নের ক্ষেত্রে তারা রাজনৈতিক বা দলীয় প্রভাবমুক্ত থেকে নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেবেন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

বাংলাদেশে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়, প্রশাসনিক দক্ষতা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আচরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের সময় নিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হয়েছিল। পরে তাকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সময়ও বিভিন্ন নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনের ঘটনাও ঘটেছে।

উপাচার্য নিয়োগের এই সংকট থেকে উত্তরণে কিছু জরুরি সংস্কার প্রয়োজন বলে মনে করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান।

তিনি বলেন, আমলাতন্ত্রের প্রভাবমুক্ত থেকে শিক্ষা ভাবনায় গ্রহণযোগ্য ও স্বাধীন ব্যক্তিদের নিয়ে সার্চ কমিটি গঠন করা দরকার। প্রার্থীকে দায়িত্ব নেওয়ার পর চার বছর মেয়াদে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনাসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট রূপরেখা ও প্ল্যান উপস্থাপন করতে বলতে হবে। বিদ্যমান আইন মেনে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষ জ্ঞকে নিয়োগ দেওয়া এবং ব্যক্তিগত বা দলীয় আনুগত্যের চেয়ে যোগ্যতা ও দক্ষতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব এবং বর্তমান সার্চ কমিটির সভাপতি আবদুল খালেকের ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

Related Articles

Latest Posts