ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পকে প্রতীকী ভর্ৎসনা, প্রস্তাব পাস করল মার্কিন কংগ্রেস

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতীকী অবস্থান নিয়ে মঙ্গলবার একটি প্রস্তাব পাস করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেট।

তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার আলোচনা চলার মধ্যেই এ পদক্ষেপ হোয়াইট হাউসের জন্য নতুন রাজনৈতিক চাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এএফপি জানিয়েছে, প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) আগে অনুমোদিত প্রস্তাবটি সিনেটে ৫০-৪৮ ভোটে পাস হয়। এতে কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক তৎপরতা থেকে মার্কিন বাহিনীকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তবে এটি একটি ‘কনকারেন্ট রেজ্যুলেশন’ হওয়ায় প্রেসিডেন্টের সইয়ের জন্য হোয়াইট হাউসে পাঠানো হবে না এবং এর আইনি কার্যকারিতা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে।

তারপরও প্রস্তাবটি পাস হওয়ার ফলে কংগ্রেসের উভয় কক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে সেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে অবস্থান নিলো, যা ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। এই সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং পরে লেবানন ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশকে জড়িয়ে বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নেয়।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদকালে ২০১৯ ও ২০২০ সালে যথাক্রমে ইয়েমেন ও ইরানে সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে ‘ওয়ার পাওয়ারস’ বিল পাস করেছিল কংগ্রেস। তবে ট্রাম্প সেগুলোতে ভেটো দেন এবং কংগ্রেস তা অতিক্রম করতে ব্যর্থ হয়।

মঙ্গলবারের ভোটের পর নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প প্রস্তাবটিকে ‘ভুল সময়ে নেওয়া অর্থহীন পদক্ষেপ’ বলে মন্তব্য করেন।

তিনি লেখেন, ‘এই সিনেটররা আমার কাজকে আরও কঠিন করে তুলেছেন। কিন্তু যেভাবেই হোক আমি কাজটি সম্পন্ন করব, কারণ আমি সবসময়ই তা করে থাকি।’

এ ভোটাভুটির সময় ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে একটি প্রাথমিক সমঝোতা স্মারককে চূড়ান্ত চুক্তিতে রূপ দিতে ৬০ দিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল। সম্ভাব্য ওই চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ এবং হরমুজ প্রণালির নৌচলাচলের বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সিনেটে ডেমোক্র্যাটিক নেতা চাক শুমার ভোটের আয়োজন করেন, যাতে রিপাবলিকানদের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়। ট্রাম্পের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মিত্র যুদ্ধ এবং যুদ্ধ-সমাপ্তি চুক্তি—উভয় বিষয় নিয়েই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।

ভোটের আগে দেওয়া বক্তব্যে শুমার বলেন, ‘রিপাবলিকানরা বন্ধ দরজার আড়ালে ট্রাম্পের যুদ্ধ, গোপনীয়তা ও ইরান চুক্তি নিয়ে যতই সমালোচনা করুক না কেন, যুদ্ধের স্থায়ী অবসান নিশ্চিত করতে হলে তাদের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।’

এর আগে রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদেও প্রস্তাবটি পাস হয়। সেখানে চারজন রিপাবলিকান সদস্য সব ডেমোক্র্যাট সদস্যের সঙ্গে একযোগে এর পক্ষে ভোট দেন, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও যুদ্ধসংক্রান্ত বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান থেকে বিরল বিচ্যুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ডেমোক্র্যাটদের অভিযোগ, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন।

‘বিপজ্জনক সম্ভাবনা’

১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বিদেশে সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী মোতায়েনের ৬০ দিনের মধ্যে কংগ্রেসের অনুমোদন নিতে হয়। তবে আইনটির প্রয়োগ নিয়ে বিভিন্ন প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়ে এসেছে।

হোয়াইট হাউসের দাবি, ইরানের ওপর প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার উদ্যোগ অসাংবিধানিক। তাদের মতে, ট্রাম্প ঘোষিত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে সংঘাত ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে।

প্রশাসনের আরও বক্তব্য, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা খর্ব করা হলে ইরানের সঙ্গে চলমান আলোচনায় ওয়াশিংটনের দরকষাকষির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

ভোটের আগে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার মাইক জনসন বলেন, আলোচনার সময় প্রধান সেনাপতির ক্ষমতা সীমিত করা ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক সম্ভাবনা’।

তবে ডেমোক্র্যাট ও কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতার দাবি, আইনি সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও যুদ্ধ চলেছে এবং ট্রাম্প বারবার নতুন হামলার হুমকি দিয়েছেন।

যুদ্ধের ব্যয় নিয়েও কংগ্রেসে উদ্বেগ বাড়ছে। সংঘাতের কারণে বাণিজ্যপথে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে, জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ভোটারদের ওপর নতুন চাপ তৈরি হয়েছে।

ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান একটি প্রাথমিক চুক্তিতে সই করার পর থেকেই দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনা দ্রুত এগিয়েছে। ওই চুক্তির লক্ষ্য ছিল বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাত বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা।

তবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বিষয়ে এখনও মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

মঙ্গলবার ইরান জানায়, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের অনুমতি জাতিসংঘের পারমাণবিক পর্যবেক্ষক সংস্থাকে দেওয়া হবে না। এর মাধ্যমে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়, যেখানে তিনি বলেছিলেন ইরান পুনরায় পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে।

অন্যদিকে ট্রাম্প সামাজিকমাধ্যমে দাবি করেন, ইরান ‘সর্বোচ্চ মাত্রার’ পারমাণবিক পরিদর্শন মেনে নিয়েছে।

এদিকে তেহরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, যুদ্ধের আগে যে ধরনের অবাধ নৌচলাচল হরমুজ প্রণালিতে ছিল, সেই পরিস্থিতি ‘আর কখনও ফিরে আসবে না’। যদিও গুরুত্বপূর্ণ এ নৌপথ সচল রাখতে নতুন যোগাযোগ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Related Articles

Latest Posts