সেই চিরায়ত দ্বন্দ্ব আর রোমাঞ্চকর ইতিহাসের পাতা আরও একবার ওল্টাতে চলেছে ফুটবল বিশ্ব। কাতার বিশ্বকাপের মুকুট ধরে রাখার মিশনে থাকা আর্জেন্টিনা এবার সেমিফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ডের। ফুটবলীয় দ্বৈরথ, রাজনৈতিক ইতিহাস, মাঠের বাইরের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই আর আবেগ—আটলান্টায় বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের এই ম্যাচকে ‘স্পেশাল’ আখ্যা দিয়ে নামতে মুখিয়ে আছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা লিওনেল মেসি।
সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে কোয়ার্টার ফাইনালের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে ঘাম ঝরিয়েই শেষ চারে পা রেখেছে আলবিসেলেস্তেরা। ম্যাচের মাত্র ১০ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে দুর্দান্ত হেডে দলকে এগিয়ে নিয়েছিলেন আলেক্সিস মাক অ্যালিস্টার। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে ড্যান এনদোয়ের গোল সুইজারল্যান্ডকে সমতায় ফেরায়। এরপর ব্রেল এম্বোলো লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে সুইসরা রক্ষণাত্মক দেওয়াল তুলে ম্যাচ টেনে নিয়ে যায় অতিরিক্ত সময়ে। শেষ পর্যন্ত হুলিয়ান আলভারেজ আর লাউতারো মার্তিনেসের নান্দনিক ফিনিশিংয়ে জয় নিশ্চিত হয় আর্জেন্টিনার।
অন্য ম্যাচে জুড বেলিংহামের জাদুতে নরওয়েকে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে থ্রি লায়ন্সরা। আর এই সমীকরণই ফুটবলপ্রেমীদের সামনে হাজির করেছে এক দীর্ঘপ্রতীক্ষিত রোমাঞ্চ।
ক্যারিয়ারে এই প্রথম ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা জাদুকর মেসি। থ্রি লায়ন্সদের সঙ্গে এই লড়াইকে ‘স্পেশাল’ হিসেবেই দেখছেন তিনি। মেসি বলেন, ‘ইংল্যান্ডের সঙ্গে এর আগে আমার কখনো খেলার সুযোগ হয়নি, এটাই প্রথম। তাই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের এই ম্যাচটি সত্যিই অন্যরকম হতে যাচ্ছে। সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আমাদের শরীরে কিছুটা ক্লান্তি আছে, এখন ভালোভাবে বিশ্রাম নিয়ে নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।’
১৯৮৬ সালের ডিয়েগো ম্যারাডোনার সেই আলোচিত কোয়ার্টার ফাইনাল আর দুই দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ছায়া এই ম্যাচে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ফুটবল বিশ্বে জল্পনা তুঙ্গে।
তবে মাঠের বাইরের এই আবহকে পাশে রেখে মাঠের ফুটবলেই মন দিতে চান মেসি। আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী এই তারকা বলেন, ‘ইংল্যান্ড ম্যাচ নিয়ে আমার সব স্মৃতিই মূলত বিভিন্ন ভিডিও আর ছবির, যা আর্জেন্টিনার মানুষ প্রতিনিয়ত নতুন করে রোমন্থন করে। কিন্তু আমাদের বর্তমান দলটি প্রতিপক্ষ কে, তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। ইংল্যান্ড নিঃসন্দেহে বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তি, আর পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে ম্যাচ সব সময়ই অন্যরকম রোমাঞ্চ নিয়ে আসে। ক্যারিয়ারে আমি প্রায় সবার সঙ্গেই খেলেছি, শুধু ইংল্যান্ড বাকি ছিল। তাই ব্যক্তিগতভাবেও এটি আমার কাছে চমৎকার এক অভিজ্ঞতা হতে যাচ্ছে।’
আর্জেন্টাইনদের কোচ লিওনেল স্কালোনি অবশ্য ইতিহাস বা মাঠের বাইরের বৈরিতা নিয়ে অতিরিক্ত মেতে উঠতে নারাজ। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ডস যুদ্ধের ক্ষত আর ফুটবলীয় রেষারেষির দীর্ঘ ইতিহাস থাকলেও ম্যাচটিকে স্রেফ একটি ফুটবল ম্যাচ হিসেবেই দেখছেন তিনি, ‘বার্তাটা খুব পরিষ্কার—এটি শুধুই একটি ফুটবল ম্যাচ। আমরা অত্যন্ত কঠিন এক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি, যাদের দলে দারুণ একজন কোচ আছেন। এর বাইরে আর কিছু ভাবার সুযোগ নেই।’
সুইসদের বিরুদ্ধে কঠিন পরীক্ষা থেকে দল বড় শিক্ষা নিয়েছে জানিয়ে স্কালোনি যোগ করেন, ‘এই দল যা অর্জন করেছে তা ঐতিহাসিক। আবারও সেমিফাইনালে ওঠা সহজ কথা নয়। আমরা খুশি ও রোমাঞ্চিত। ফাইনালে যেতে আমরা মাঠের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত ঢেলে দেব।’
অতিরিক্ত সময়ে মাঠে নেমে আলভারেজের দারুণ গোলে অ্যাসিস্ট করা পালমেইরাসের ফরোয়ার্ড হোসে লোপেজও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াইয়ের বার্তা দিয়ে রাখলেন। লোপেজ বলেন, ‘মাঠের ভেতরে ও বাইরে এই লড়াইয়ের পেছনে দীর্ঘ ইতিহাস, অনেক কষ্ট আর আবেগ জড়িয়ে আছে। তবে আমরা পেশাদার। মাঠের শেষ সেকেন্ড পর্যন্ত নিজেদের জীবন বাজি রেখে আমরা লড়ে যাব।’
বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড—ফুটবল রোমান্টিকদের জন্য এর চেয়ে বড় উপহার আর কী হতে পারে! আগামী বুধবারে বাংলাদেশ সময় দিবাগত রাতে আটলান্টার মাঠেই মিলবে সব প্রশ্নের উত্তর।

