আল্টিমেটামের শেষ মুহূর্তে কঠিন পরীক্ষায় ট্রাম্প—স্থলযুদ্ধ নাকি আলোচনা

ইরানে চলমান যুদ্ধে এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের মুখে দাঁড়িয়ে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি কি স্থলযুদ্ধে জড়াবেন, নাকি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজবেন?

হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানকে দেওয়া ট্রাম্পের আল্টিমেটাম শেষ হচ্ছে আগামীকাল সোমবার। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নির্ধারিত যুদ্ধের সম্ভাব্য চার থেকে ছয় সপ্তাহের সময়সীমাও শেষ হচ্ছে আগামী সপ্তাহে।

এ অবস্থায় এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

আজ রোববার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের স্বভাবজাত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে ট্রাম্প বলেন, ‘যদি তারা (ইরান) দ্রুত কোনো চুক্তিতে না আসে, তবে আমি সবকিছু উড়িয়ে দেওয়ার ও তেলক্ষেত্রগুলো নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার কথা ভাবছি।’

সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি চালু করাকে একটি অ-আলোচনাযোগ্য ইস্যু হিসেবে দেখছে ট্রাম্প প্রশাসন।

ইরান স্পষ্ট জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামলা বন্ধ না করা পর্যন্ত তারা কোনো আলোচনায় বসবে না।

পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উপসাগরীয় দেশগুলো ইতোমধ্যে দুই দিনব্যাপী অলোচনা করলেও কোনো সমাধান আসেনি।

তবে পাকিস্তান এখনও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনার আয়োজনের চেষ্টা করছে। 
এ অবস্থায় কূটনৈতিক পথ আপাতত স্থবির।

সামনে রয়েছে সামরিক বিকল্প। চার হাজারের বেশি মার্কিন মেরিন ও ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের সেনা ইতোমধ্যে ওই অঞ্চলে মোতায়েন করা হয়েছে।

এর মাধ্যমে ট্রাম্প চাইলে ইরানের খার্গ দ্বীপের তেল স্থাপনা দখল, হরমুজ প্রণালি জোর করে খুলে দেওয়া কিংবা ইরানের পারমাণবিক উপকরণ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো পদক্ষেপ নিতে পারেন।

তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের ঝুঁকি অনেক।

এর মধ্যে খারগ দ্বীপ দখল করা হলেও সেটি সচল রাখতে দীর্ঘ সময় মার্কিন সেনা উপস্থিতি প্রয়োজন হবে।

একইভাবে হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নিতে গেলে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইরান ইতোমধ্যে দাবি করছে, প্রণালিটি তাদের সার্বভৌম এলাকা এবং জাহাজ পারাপারে বড় অংকের অর্থও নিচ্ছে তারা।

যুদ্ধের শুরুর দিকে হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রীয় ইস্যু ছিল না। কিন্তু এখন ইরানের নিয়ন্ত্রণের কারণে বৈশ্বিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় সংঘাতের অন্যতম প্রধান প্রশ্নে পরিণত হয়েছে এটি।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ‘ইরানের সম্মতি বা আন্তর্জাতিক জোট—যেভাবেই হোক প্রণালি খুলতেই হবে।’

ট্রাম্প আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়ে বলেছেন, যদি প্রণালি খোলা না হয়, তবে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেলক্ষেত্র ও খারগ দ্বীপ ধ্বংস করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

যদিও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এমন হামলা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের একই ধরনের স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে।

জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রবার্ট এস লিটওয়াক নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়াই ‘পারস্পরিক ধ্বংস নিশ্চিত’ করার মতো সক্ষমতা তৈরি করেছে ইরান। ফলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।’  

তিনি আরও বলেন, ‘ট্রাম্প যদি ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা করেন, তবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি ও লবনাক্ত পানি পরিশোধন কেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেবে।’

ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরেও লক্ষ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। শুরুতে ট্রাম্পের লক্ষ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন ও পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংস করা।

কিন্তু এখন সুর কিছুটা নরম। ট্রাম্প দাবি করছেন, ইরানের ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ হয়ে গেছে। কারণ আগের অনেক নেতা নিহত হয়েছেন। আর ইরানের পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত মাটির অনেক গভীরে লুকানো আছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প।

নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, ট্রাম্পের কৌশলগত দ্বিধার মূলে রয়েছে এই বাস্তবতা যে এক মাসে ১১ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পরও তিনি ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারেননি, যার কথা তিনি ২৮ ফেব্রুয়ারি অভিযান শুরুর সময় বলেছিলেন।

সব মিলিয়ে, ট্রাম্প এখন এক জটিল কৌশলগত দ্বিধার মুখে—যেখানে একদিকে রয়েছে আলোচনার অনিশ্চিত পথ, অন্যদিকে স্থলযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার বড় ঝুঁকি।

এ সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্র কতদিন এবং কতটা গভীরভাবে এই সংঘাতে জড়িত থাকবে।

যদিও ফক্স নিউজকে ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, সোমবার ইরানের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছানোর ‘ভালো সম্ভাবনা’ রয়েছে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।

Related Articles

Latest Posts