ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গা উপজেলায় কলেজশিক্ষার্থী সুমন শেখ (২৪) হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের বাড়িতে দফায় দফায় হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, দিন-রাতে এসব ঘটনা ঘটলেও তা ঠেকাতে পুলিশ কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলার টগরবন্দ ইউনিয়নের বড়ভাগ গ্রামের অন্তত ১০টি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের চিত্র দেখা যায়।
গত ২৬ জুন সন্ধ্যায় বড়ভাগ পূর্বপাড়ায় উকিল শেখের বাড়ির সামনে পূর্বশত্রুতা ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হামলায় নিহত হন সুমন শেখ। তিনি বড়ভাগ গ্রামের আলাউদ্দিন শেখের ছেলে ও কাশিয়ানী উপজেলার এম এ খালেক ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
এ ঘটনায় গত ২৭ জুন সুমনের ভাই শামীম শেখ ১৭ জনকে আসামি করে আলফাডাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা করেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হত্যাকাণ্ডের রাতেই প্রথমে উকিল শেখের বাড়িতে হামলা চালানো হয়। এরপর ২৯ জুন সন্ধ্যায় হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবিতে আলফাডাঙ্গা থানার সামনে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। মানববন্ধন শেষে দিন-রাত ধারাবাহিকভাবে বড়ভাগ গ্রামের বিভিন্ন মহল্লার বাসিন্দারা প্রতিপক্ষের অন্তত ১০টি বাড়িতে ভাঙচুর চালান বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে টগরবন্দ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মিয়া আসাদুজ্জামান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, স্থানীয় আধিপত্য নিয়ে সাবেক ইউপি সদস্য কুদ্দুস শেখের ছেলে হুসাইন শেখ ও মুরাদ খানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। নিহত সুমন শেখ মুরাদ খানের সমর্থক।
তিনি বলেন, কয়েক বছর আগে মুরাদ খানের পক্ষের সমর্থকরা হুসাইন শেখের ডান হাত কবজি থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন। এ নিয়ে আদালতে একটি মামলা চলমান।
গতকাল সরেজমিনে টগরবন্ধ ইউনিয়নের বড়ভাগ গ্রামে দেখা যায়, কুদ্দুস শেখের পাকা ও আধপাকা ঘর ভাঙচুর ও আসবাবপত্র লুটপাট করা হয়েছে। একই অবস্থা পাশে হুসাইন শেখের দোতালা ভবনের।
স্থানীয়রা জানান, এ পর্যন্ত তিন দফা হামলা চালানো হয়েছে। সেসময় বাড়ির সদস্যরা বের হয়ে যান। কয়েকশ মানুষের একটি দল প্রথম দফায় ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। পরের দফায় শাবল-হাতুড়ি দিয়ে নির্মাণাধীন বাড়িসহ অন্তত ১০টি পরিবারের পাকা ও আধপাকা বাড়ি ভাঙচুর করা হয়। তারা দরজা ও জানালা খুলে নিয়ে যান।
তারা আরও জানান, কুদ্দুস শেখ, হুসাইন শেখ ও উকিল শেখসহ এনায়েত শেখ, জনি শেখ, আলিম শেখ, শাহাদাৎ শেখ, আজগর শেখ, উজ্জ্বল শেখ, রকিব শেখের বাড়িতে এ হামলা চালানো হয়।
হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা এলাকায় না থাকায় তাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে আলিম শেখের স্ত্রী শাপলা বেগম থানার ওসির কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেন।
সেখানে শাপলা বেগম বলেন, হামলাকারীরা আলমারি ভেঙে নগদ ৫ লাখ টাকা ও ১৫ ভরি স্বর্ণালংকার লুট করে নিয়ে গেছে। এছাড়া তারা ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করে ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্রও নিয়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, আমি প্রতিবাদ করলে তারা আমাকে হত্যার হুমকি দেয়। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার বিচার চাই ও নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আজ আলফাডাঙ্গা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফকির ফাইজুর রহমান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, অভিযোগ নিয়ে কেউ থানায় আসেননি।
এদিকে, প্রতিপক্ষের বাড়িতে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে নিহতের ভাই শামীম শেখ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘হত্যার ২১ দিন পার হয়ে গেলেও এজাহারভুক্ত মাত্র একজন আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্য আসামিরা ধরা ছোঁয়ার বাইরে থেকে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আসামিরা এখনো আমাদের হুমকি দিচ্ছে। বলছে একটি লাশ পড়েছে, আরও পাঁচ-ছয়টি লাশ পড়বে।’
হামলার ঘটনায় কোনো মন্তব্য করেননি ওসি ফকির ফাইজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ওপরের নির্দেশ আছে।’
তিনি ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) কাছ থেকে বক্তব্য নিতে বলেন।
ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. শামসুল আজম ডেইলি স্টারকে বলেন, ১৭ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যা মামলা হয়েছে। ইতোমধ্যে এজাহারভুক্ত এক আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষের বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও তদন্ত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, বাড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনায় কেউ মামলা করেননি। অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, গতকাল এ মামলার তদন্তের ভার ফরিদপুর ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

