সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ‘গোপনে’ ঘনিষ্ঠ মিত্র সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার স্ত্রী সারা। তাদের সঙ্গে কয়েকজন ঊর্ধ্বতন ইসরায়েলি কর্মকর্তাও ছিলেন।
দুই দেশের সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
ওই বৈঠকের উদ্দেশ্য নিয়ে জল্পনাকল্পনার মধ্যেই নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, দেশটিতে আগামী ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনের আগে ‘শত্রুরা’ হামলা চালানোর পাঁয়তারা করছে। ইতোমধ্যে তিনি বিষয়টি বিরোধীদলের নেতা ইয়ার লাপিদকেও জানিয়েছেন।
তবে আজ বুধবার টাইমস অব ইসরায়েলের দেওয়া তথ্য বলছে—দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী লাপিদ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর এই দাবিকে উড়িয়ে দিয়েছেন।
লাপিদ জানান, নেতানিয়াহু অকারণে দেশের মানুষকে ভীত করে তুলতে চাইছেন। তিনি নেতানিয়াহুর এই বক্তব্যকে ‘নির্বাচনী প্রচারণা’ বলে আখ্যা দেন এবং দাবি করেন, সঠিক সময়ে সুষ্ঠুভাবেই নির্বাচন আয়োজিত হবে।
অপরদিকে সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে নেতানিয়াহুর জোট ও তার বিপক্ষ জোট উভয়ই ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে ৫৩টি করে আসন পেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইসলামপন্থি রা’আম (ইউনাইটেড আরব লিস্ট) ও হাদাশ-তা’আল জোটের হাতেই থাকবে ‘কিংমেকার’ হওয়ার বা নির্বাচনের ফল নির্ধারণের চাবিকাঠি।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র সংগঠন হামাস রক্তক্ষয়ী হামলা চালায়। ওই ঘটনার জেরে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালায় ইসরায়েল।
সংবাদ প্রতিবেদনগুলো থেকে জানা যায়—হামাসের সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিল মিত্র আরব আমিরাত ও প্রতিবেশী মিসর। তবে তাতে ‘কান’ দেননি নেতানিয়াহু বা তার প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা।
জাতীয় নির্বাচনের আগে এমন বিব্রতকর তথ্য স্বীকার করতে চাচ্ছেন না নেতানিয়াহু। এ ধরনের কোনো দাবি যাতে প্রকাশ্যে না আসে, তা ধামাচাপা দিতে উঠে পড়ে লেগেছেন গাজায় গণহত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত, আন্তর্জাতিক আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নিয়ে ঘোরা ও সারাবিশ্বে সবচেয়ে ঘৃণিত এই ইসরায়েলি নেতা।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদনে সূত্রের বরাতে দাবি করা হয়েছে—হামাসের সম্ভাব্য হামলার হুমকি সম্পর্কে নেতানিয়াহুকে সতর্ক করার খবর অস্বীকার করতে আমিরাতের নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদকে অনুরোধ করাই ছিল নেতানিয়াহুর সফরের মূল উদ্দেশ্য।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের পাশাপাশি আমিরাতের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ওয়াইএএম বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করে। তবে বৈঠকের কারণ সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনকে ‘ভুয়া’ বলে মন্তব্য করেছে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।
অন্যদিকে ওয়াইএএম আরও জানিয়েছে—‘আমিরাত ও ইসরায়েলের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার ও উন্নয়নের উপায় নিয়ে আলোচনা করেছে দুই পক্ষ।’
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে—গত ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুরের দিকে একটি ব্যক্তিগত উড়োজাহাজে আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি পৌঁছান নেতানিয়াহু। সেখানে তিনি প্রায় চার ঘণ্টা অবস্থান করেন।
সেদিন রাতে প্রথম এ খবর প্রকাশ করে ইসরায়েলের চ্যানেল ১২।
এই সফর সম্পর্কে অবহিত দুই ব্যক্তির ভাষ্য, সে সময় আমিরাতের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক ঘণ্টার বৈঠক করেন নেতানিয়াহু। চ্যানেল ১২ জানায়, বিমানবন্দরেই এ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে বৈঠকের পর মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের নিয়ে পৃথক বৈঠক করেন নেতানিয়াহু। এসব দেশের কয়েকটির সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই। ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম কান এ তথ্য জানিয়েছে।
নেতানিয়াহুর স্ত্রী সারাও এ সফরে ছিলেন বলে সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়।
সফরসঙ্গীদের মধ্যে আরও ছিলেন ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান রোমান গফম্যান, দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান শমুয়েল বেন-এজরা, সামরিক সচিব মেজর জেনারেল গাই মার্কিজেনো ও অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতের নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান।
সফরসঙ্গী হিসেবে নেতানিয়াহুর স্ত্রীকে অন্তর্ভুক্ত করার কারণ জানানো হয়নি।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট জানিয়েছে—সৌদি আরব লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা ঠেকাতে ইসরায়েলের সহায়তা চাওয়ার প্রেক্ষাপটে মোসাদ প্রধান রোমান গফম্যান এই বৈঠক আয়োজন করেন।
অন্যান্য সংবাদমাধ্যম জানায়—সৌদি আরব, জর্ডান, লিবিয়া, কাতার ও মরক্কোর প্রতিনিধিরাও আবুধাবির সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
তিন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা বার্তাসংস্থা রয়টার্সকে জানান, গত ২৭ সেপ্টেম্বরের বৈঠকটি প্রায় ছয় ঘণ্টা ধরে চলেছিল। এর মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ইরান।
সেই বৈঠকে ইরানের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম কান।
হামাসের নেতৃত্বে ৭ অক্টোবরের হামলার প্রায় দেড় সপ্তাহ আগে আমিরাতের নেতা নেতানিয়াহুকে সতর্ক করেছিলেন বলে খবর প্রকাশের পর ইসরায়েলে তোলপাড় চলছে।
হামলার কয়েক দিন আগে মিসরের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধানসহ আরও কয়েকটি পক্ষ সতর্কবার্তা দিয়েছিল বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই নেতানিয়াহু গোপনে আমিরাত সফর করলেন।
নেতানিয়াহুর আমিরাত সফর সম্পর্কে জানেন এমন এক ব্যক্তি জানিয়েছেন, বৈঠকে বিন জায়েদের কথিত সতর্কবার্তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
চলতি মাসের শুরুতে ইসরায়েলি সংবাদপত্র হারেৎজ এ বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
নেতানিয়াহু ও বিন জায়েদের বৈঠক সম্পর্কে প্রত্যক্ষ তথ্যের ভিত্তিতে সেই ব্যক্তি জানিয়েছেন, প্রতিবেদনটি অস্বীকার করতে বিন জায়েদকে অনুরোধ করেন নেতানিয়াহু।
এর আগে হারেৎজ-এর প্রতিবেদন অস্বীকার করে নেতানিয়াহুর কার্যালয়।
গোপন সফর নিয়ে কথা বলার জন্য ওই ব্যক্তি এবং বৈঠক সম্পর্কে অবহিত এক আঞ্চলিক কর্মকর্তা নিজেদের নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য দিয়েছেন।
তবে বৈঠক নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন সম্পর্কে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের ‘খোলামেলা ও সরাসরি যোগাযোগের পথ’ রয়েছে এবং দেশ দুটি ‘প্রাসঙ্গিক সব গোয়েন্দা তথ্য’ বিনিময় করে।
চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, বিন জায়েদের কাছ থেকে অস্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করতে নেতানিয়াহুর কার্যালয় বারবার বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছিল।
তবে আমিরাত বিষয়টিকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অংশ হিসেবে দেখছে। ইসরায়েলের আসন্ন নির্বাচনের আগে এ ধরনের স্পর্শকাতর বিষয়ে জড়াতে চায় না আমিরাত।
এর আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়—গত মে মাসেও নেতানিয়াহু গোপনে আমিরাত সফর করেছিলেন। সে সময় তিনি দেশটির প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও দেখা করেন।
তবে সে সময় আরব আমিরাত ওই দাবি অস্বীকার করেছিল।
একটি সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, গত ২৬ মার্চ নেতানিয়াহু ও শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ ওমান সীমান্তের কাছে আবুধাবির আল-আইন শহরে বৈঠক করেন।
ইরান যুদ্ধে আরব আমিরাত আক্রান্ত হওয়ায় আবুধাবির সঙ্গে তেল আবিব ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
২০২০ সালের আব্রাহাম চুক্তিতে সই করার পর ইসরায়েল-আমিরাতের সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়।
বিশ্লেষকদের মত, ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আমিরাতকে এ অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের পথ সুগম করেছে।
ইরানের হামলা থেকে সুরক্ষা দিতে আমিরাতে নিজেদের অত্যাধুনিক আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মোতায়েন করে ইসরায়েল।
আবুধাবি ও তেল আবিবের কর্মকর্তারা জানান, দুই দেশের নিরাপত্তাবিষয়ক পারস্পরিক সহযোগিতার মাত্রা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তবে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট ও মিশরের গোয়েন্দা প্রধানের কাছ থেকে হামাসের হামলা নিয়ে আগাম সতর্কবাণী পেয়েছেন—এ সংক্রান্ত ‘মিথ্যা’ প্রতিবেদন ছাপানোর অভিযোগে নেতানিয়াহু একাধিক সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দিয়েছেন।
তার দল লিকুদ পার্টি গতকাল এক ঘোষণায় এই তথ্য জানিয়েছে।

