‘আমি সবসময় কইছি, আমার ফুয়ারে (ছেলেকে) ইতার মধ্যে না নেওয়ার লাগি।’ ২০ বছর বয়সী ছেলেকে হারিয়ে এভাবেই আহাজারি করছিলেন মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার তারা মিয়ার মা আজিরুন বেগম (৫০)। তার একটাই দাবি—যারা তার ছেলেকে চোরাকারবারের কাজে নিয়ে গিয়েছিল, তাদের বিচার।
গতকাল রোববার ভোরে ভারতের মাগুরুলি এলাকায় সীমান্তের ওপারে বিএসএফের গুলিতে নিহত হন তারা মিয়া। তিনি কুলাউড়া উপজেলার পৃথিমপাশা ইউনিয়নের মুড়ইছড়া বস্তির আব্দুল মালেকের ছেলে।
বিজিবির ভাষ্য, ভোর ৪টার দিকে চোরাকারবারিদের একটি দল সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের যাওয়ার সময় বিএসএফ গুলি চালায়। এতে তারা মিয়া নিহত হন।
৪৬ বিজিবির শ্রীমঙ্গল ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ তারা মিয়ার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, তারা মিয়ার বিরুদ্ধে চোরাকারবারের একটি মামলাও রয়েছে।
তবে পরিবারের দাবি, সীমান্তকেন্দ্রিক চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত মূল ব্যক্তিরা নিজেরা ঝুঁকি না নিয়ে তরুণ ও কম বয়সী ছেলেদের ব্যবহার করেন। প্রলোভন দেখিয়ে কিংবা চাপ দিয়ে তাদের সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়।
তারা মিয়ার বড় ভাই রাজু বলেন, তার ভাই অভাবী ছিলেন না। তাদের বাড়িঘর ও গাড়ি রয়েছে। তার অভিযোগ, চোরাকারবারিরা সাহস দেখিয়ে জোর করে তার ভাইকে এই কাজে নিয়ে যায়।
ঘটনার রাতের বর্ণনা দিয়ে রাজু বলেন, রাত ২টার দিকে তিনি স্থানীয় রবিরবাজারে ছিলেন। তখন একজন ফোন করে জানান, তারা মিয়াকে পাওয়া যাচ্ছে না, তাকে খুঁজতে হবে। পরে জানতে পারেন, তারা সীমান্তের দিকে গেছেন।
রাজুর অভিযোগ, চোরাকারবারিরা নিজেরা সীমান্তে না গিয়ে ছোট ছেলেদের দিয়ে পণ্য পারাপার করান।
তিনি বলেন, ছোট ছোট ছেলেদের লোভ দেখিয়ে মাল আনতে পাঠায়। এক-দেড় বছর আগেও আমার পাশের ঘরের ১৩ বছরের একটি ছেলে বিএসএফের গুলিতে মারা গেছে।
ভাইয়ের মৃত্যুর পর আর কোনো পরিবারকে যেন একই পরিণতির শিকার হতে না হয়, সেই দাবি জানিয়ে রাজু বলেন, আমার ভাই তো মারা গেছে, তাকে আর পাব না। আমি চাই, আর কেউ যেন এই কাজে না যায় এবং আর কোনো পরিবার যেন এভাবে স্বজন না হারায়।
তারা মিয়ার আরেক ভাই রজাক আলী বলেন, যারা আমার ভাইকে নিয়ে গেছে এবং মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে, আমরা তাদের সঠিক বিচার চাই।
ছেলেকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তারা মিয়ার মা। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, আমি সবসময় কইছি, আমার ফুয়ারে (ছেলেকে) ইতার মধ্যে না নেওয়ার লাগি। এর বাদেও তারা আমার ফুয়ারে নিয়ে গেছে। আমি আমার ফুয়া হত্যার উপযুক্ত বিচার চাই।
পরিবারটি দ্রুত তারা মিয়ার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে চোরাকারবারের নেপথ্যে থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সীমান্তে তরুণদের ব্যবহার বন্ধে কার্যকর নজরদারির দাবি জানিয়েছে।
তারা মিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় তাই শুধু একটি পরিবারের শোকই সামনে আসেনি, সামনে এসেছে সীমান্ত এলাকায় তরুণদের চোরাকারবারে ব্যবহারের অভিযোগও।
পরিবারের প্রশ্ন, যারা তরুণদের ঝুঁকির মুখে পাঠাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে শুধু সীমান্ত পার হওয়া তরুণদের দায়ী করলে এই মৃত্যুর ধারাবাহিকতা কীভাবে থামবে?

