আজও ছেলের ছবি হাতে কাঁদছেন মা, মানবেতর জীবন কাটছে বেঁচে ফেরাদের

সাভারে রানা প্লাজা ধসের ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত দোষীদের বিচার কিংবা ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত হয়নি। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন ১০ তলা ভবনটি ধসে পড়লে অন্তত এক হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক প্রাণ হারান। এই ঘটনায় আহত হন দুই সহস্রাধিক শ্রমিক।

দীর্ঘ এই সময়ে ন্যায়বিচার, উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসনের দাবিতে নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন চলে আসলেও আজ পর্যন্ত তাদের একটি দাবিও পূরণ হয়নি। দেড় দশক ছুঁইছুঁই এই সময়ে দোষীদের শাস্তি না হওয়া এবং পুনর্বাসনের দাবিগুলো উপেক্ষিত থাকায় নিহতদের স্বজন ও পঙ্গুত্ব বরণকারী শ্রমিকদের কষ্ট কেবল ভারীই হয়েছে। তাদের অভিযোগ, এত বছরেও তাদের জীবনমানের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

আজ শুক্রবার প্রতি বছরের মতো সেই ভয়াবহ স্মৃতি নিয়ে ধসে পড়া রানা প্লাজার সামনে জড়ো হন নিহতদের স্বজন, আহত শ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা। সেখানে তারা অস্থায়ী বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং নিজেদের ন্যায্য পাওনা ও ন্যায়বিচারের দাবি পুনরায় তুলে ধরেন।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে উপস্থিত শ্রমিক ও স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রানা প্লাজা ধস স্রেফ কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি ছিল একটি ‘পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড’। তারা অনতিবিলম্বে এই হত্যাকাণ্ডের চূড়ান্ত বিচার ও শ্রম আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

আজও ছেলের লাশের অপেক্ষায় মা

রানা প্লাজা ভবনের আইরনম্যান হিসেবে কাজ করতেন বগুড়ার সুরুজ মিয়া (২০)। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সুরুজ রানা প্লাজা ভবন ধসে নিখোঁজ হন। আজও সুরুজের লাশের হদিস পাননি মা জোসনা বেগম (৬০)। প্রতি বছর এই দিনে ছেলের ছবি সংবলিত ছোট্ট প্লাকার্ড নিয়ে রানা প্লাজা ভবনের সামনে এসে অঝোরে কাঁদতে থাকেন।

জোসনা বেগম কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘স্বামী সন্তানদের ছোট রেখে মারা যান। তারপর কষ্ট করে দুই ছেলেকে বড় করি। বড় ছেলেটা প্রতিবন্ধী, কাজ করতে পারে না। একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিল সুরুজ। আমার সুরুজ রানা প্লাজা ভবনের নিচে চাপা পড়ে নিখোঁজ হয়। আজও ছেলের লাশ পেলাম না, ক্ষতিপূরণ পেলাম না, বিচার পেলাম না। আমার কলিজা হত্যার বিচার পেলাম না। আমি মা হিসেবে হত্যাকারীদের বিচার চাই।’

আহতদের মানবেতর জীবন

রানা প্লাজা ভবনে সুইং অপারেটর হিসেবে কাজ করতেন নিলুফা বেগম (৪৫)। ওই ঘটনায় প্রাণে বেঁচে ফিরলেও পা ও মেরুদণ্ডে আঘাত পেয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন তিনি।

নিলুফা বেগম জানান, ডান পায়ে এখন পর্যন্ত ১১টি অপারেশন করা হলেও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি তিনি। আরও একটি অপারেশন দরকার, যার খরচ প্রায় ৭-৮ লাখ টাকা। পাসহ শরীরের নানা অংশের আঘাত পঙ্গুত্ব এনে দিয়েছে তাকে। নেই স্বজনও।

তিনি আরও জানান, কিছুদিন ফুটপাতে পানের দোকান দিয়ে চলার পর এখন সেটিও নেই। বর্তমানে একটি খাবার হোটেলে পেঁয়াজু ভাজার কাজ নিয়েছেন; দৈনিক মজুরি ২০০ টাকা। মাসে ১০ থেকে ১২ দিন কাজ করতে পারেন। এই দিয়েই তাকে বেঁচে থাকতে হচ্ছে।

দ্য ডেইলি স্টার অন্তত ১০ জন আহত শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলেছে; তাদের প্রত্যেকেই মানবেতর জীবনযাপনের কথা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও শিল্প শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি রফিকুল ইসলাম সুজন বলেন, ‘২৪ এপ্রিলকে জাতীয়ভাবে শ্রমিক শোক দিবস ঘোষণা, রানা প্লাজার সামনে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি, রানা প্লাজার জমি অধিগ্রহণ করে ক্ষতিগ্রস্ত ও আহত শ্রমিকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা, দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং হতাহত শ্রমিকদের এক জীবনের আয়ের সমান ৪৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’

বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আক্তার দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৩ বছর পেরিয়ে গেলেও এত সংখ্যক শ্রমিক হত্যার বিচার নিশ্চিত হয়নি। শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত হয়নি। আমরা গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়ে আশা করছি, এই সরকার আমাদের দাবিগুলো পূরণ করবে এবং শ্রমিক হত্যার বিচার নিশ্চিত করবে।’

বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড সোয়েটার শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খাইরুল মামুন মিন্টু বলেন, ‘রানা প্লাজা ধসের ঘটনা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচার এখনো নিশ্চিত হয়নি। শেখ হাসিনার সরকার রানা প্লাজা ট্রাজেডি সংক্রান্ত একটি দাবিও পূরণ করেনি। অন্তর্বর্তী সরকারও রানা প্লাজার শ্রমিকদের দাবি-দাওয়া পূরণ করেনি। দোষীদের শাস্তি নিশ্চিতে কোনো ভূমিকা রাখেনি। বর্তমান বিএনপি সরকার শ্রমিক হত্যার বিচার নিশ্চিত ও শ্রমিকদের দীর্ঘ দিনের দাবিগুলো পূরণ করবে বলে আশা করছি।’

Related Articles

Latest Posts