আইল্যান্ড গার্ল: কক্সবাজারের সমুদ্রে নিউজিল্যান্ডের পরিবারের স্বপ্নভাঙার গল্প

কক্সবাজারের সমুদ্র তখন উত্তাল। এক মুহূর্ত আগেও সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। নৌকার পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন জন এডওয়ার্ড পাডনি। পাশে তার ১৩ বছরের ছেলে রালফ। নৌকার মাঝের অংশে ছিলেন স্ত্রী বেলা আর ১৬ বছরের ছেলে আলবার্ট।

হঠাৎ রালফের চোখে পড়ে, কিছু একটা ঠিক নেই। তাদের দুই খোলের নৌকার যে অংশ কাঠের গুঁড়ি দিয়ে জোড়া লাগানো, সেটা ভেঙে যাচ্ছে। জন দ্রুত নৌকা ঘুরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন। কিন্তু ততক্ষণে সমুদ্রের ঢেউ আরও জোরে আছড়ে পড়ছে।

একটার পর একটা কাঠের গুঁড়ি ভেঙে যেতে লাগল। তারপর ভেঙে পড়ল নৌকার মাঝের অংশ। জন বলেন, হঠাৎ একটি বিশাল ঢেউ এসে পড়ল।

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ৫৮ ফুট লম্বা ক্যাটামারান নামক হাইজবোট ‘আইল্যান্ড গার্ল’ দুই টুকরো হয়ে গেল। চারজনই ছিটকে পড়লেন পানিতে। চারদিকে তখন শুধু ভাঙা কাঠ আর উত্তাল পানি।

জন সাঁতার জানতেন না। ভাঙা নৌকার একটা অংশ আঁকড়ে তিনি পানিতে ভেসে থাকার চেষ্টা করছিলেন। রালফ কোনোভাবে তার কাছে পৌঁছে বাবাকে ভাঙা নৌকার একটা অংশে তুলে নেয়। কিন্তু পরিবারের বাকি দুজন কোথায়, তখনো তারা জানেন না।

জন ছেলে রালফকে লাইফবোট আনতে বলেন। আর স্ত্রী বেলা ও ছেলে আলবার্টকেও খুঁজতে বলেন। কিন্তু ভাঙা নৌকার দুই অংশ তখনও প্রচণ্ড ঢেউয়ে ধাক্কাধাক্কি করছিল। সেখানে যাওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

একপর্যায়ে বেলা ধ্বংসাবশেষের নিচ থেকে বের হয়ে লাইফবোটে উঠতে পারেন। কিন্তু আলবার্ট পারেনি। বেলা পরে জনকে জানান, নৌকার একটা ছাউনির নিচে তিনি আলবার্টকে ধরে রেখেছিলেন। সেখানে একটু বাতাস ছিল। তিনি ছেলের মাথা পানির ওপরে রাখার চেষ্টা করছিলেন।

শুরুতে আলবার্ট শ্বাস নিচ্ছিল। তারপর একসময় বুদবুদ ওঠা বন্ধ হয়ে যায়। আর কোনো সাড়া দিচ্ছিল না আলবার্ট। কয়েক দিন পর কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাছে পাওয়া যায় তার মরদেহ। 

পরিবারটির যাত্রা, দুর্ঘটনা এবং বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে কথা বলেছেন জন এডওয়ার্ড।

‘আইল্যান্ড গার্ল’ সাধারণ কোনো নৌকা ছিল না। দুই খোলের এই নৌকাটি মোটা কাঠের গুঁড়ি দিয়ে জোড়া দেওয়া হয়েছিল। মাঝখানে চওড়া প্ল্যাটফর্ম। সামনের অংশ খোলা। মাঝখানে থাকার জায়গা। পেছনে নৌকা চালানোর ব্যবস্থা। ওপরের দিকে ত্রিপলের ছাউনি। 

ছয় মাস ধরে এই নৌকাই ছিল পরিবারটির বাড়ি। ৭৪ বছর বয়সী জন, তার ৩৪ বছর বয়সী চীনা স্ত্রী বেলা এবং তাদের দুই ছেলে রালফ ও আলবার্ট। তারা সবাই এই নৌকায় ঘুমাতেন, খেতেন, থাকতেন।

নৌকা বাঁকখালী নদীতে, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ঘাটের কাছে নোঙর করা। এটা বানাতে তাদের কয়েক বছর সময় লেগেছিল। খরচ হয়েছিল প্রায় দেড় কোটি টাকা।

তাদের পরিকল্পনা ছিল, বাংলাদেশের নদীপথ ধরে সাগরে যাবেন। এরপর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে একদিন নিউজিল্যান্ডে ফিরে যাবেন।

পরিবারটি প্রথম বাংলাদেশে আসে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর প্রায় ১০ থেকে ১২ বার বিমানে বাংলাদেশ ও নিউজিল্যান্ডে যাতায়াত করেছে পরিবারটি। জন বহু বছর ধরৈই কাঠের বাড়ি ও নৌকা তৈরির কাজ করেছেন।

নিউজিল্যান্ড ছাড়ার আগে প্রায় ১০ বছর জন কোস্ট গার্ডে কাজ করেছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। পরে জর্জিয়া ও থাইল্যান্ডেও থেকেছেন তিনি। 

তার ভাষ্য, জর্জিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে তিনি সরকারের কাছ থেকে বনভূমি ইজারা নিয়ে কাঠের বাড়ি তৈরি করতেন। পরে সেগুলো বিক্রি করতেন। তাই কক্সবাজারে এসে একটা কাঠের নৌকা বা ক্যাটামারান বানানো তার কাছে হঠাৎ নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না।

কাঠ সহজে পাওয়া যায় বলেই বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছিলেন জন। কক্সবাজারের এসএম পাড়ার একটি নৌকা তৈরির কারখানায় স্থানীয় কারিগরদের সহায়তায় তৈরি হয় ‘আইল্যান্ড গার্ল’। নৌকাটি মূলত গর্জন কাঠ দিয়ে তৈরি।

জন বলেন, গর্জন গাছ বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এই গাছ কাটার ওপর বিধিনিষেধ আছে। তাই কাঠ সংগ্রহের জন্য তিনি আইনি প্রক্রিয়াও অনুসরণ করেন। দুটি খোল জোড়া দেওয়ার জন্য ছয়টি উন্নতমানের গর্জন কাঠের গুঁড়ি কিনেছিলেন তিনি।

নৌকার প্রতি অংশে তিনটি করে কক্ষ ছিল। সব মিলিয়ে ছয়টি কক্ষ। দুটি ইঞ্জিনও ছিল। প্রত্যেকটির ক্ষমতা প্রায় ১২০ হর্সপাওয়ার। প্রথমে ভেবেছিলেন পাঁচ-ছয় মাসেই নৌকা বানানো যাবে। কিন্তু সময় লাগে দেড় বছরেরও বেশি।

২০২৫ সালের জুনে কক্সবাজার শহীদ মিনারের বিপরীতে আল-বারাকা টাওয়ারে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলেন জন। সেখানে প্রায় ছয় মাস ছিলেন। তারপর ধীরে ধীরে নৌকাই হয়ে ওঠে তাদের ঘর।

পরিবারটি বাঁকখালী নদীতে নৌকাটি নোঙর করে বসবাস শুরু করে। জন চেয়েছিলেন আইল্যান্ড গার্লকে বাংলাদেশের নদীপথ দিয়ে সমুদ্রে নিয়ে যাবেন। তারপর সাগর পাড়ি দিয়ে নিউজিল্যান্ডে ফিরে যাবেন।

এরই মধ্যে একবার নৌকায় করে তারা চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন। ফেরার পথে সোনাদিয়া দ্বীপে নোঙর করেন। সেখানেই আরেক বিপদ আসে।

২০২৬ সালের ৮ এপ্রিল সোনাদিয়া দ্বীপে থাকার সময় একদল দুর্বৃত্ত পরিবারটির ওপর হামলা করে। কোস্ট গার্ডের একটি দল তাদের উদ্ধার করে। লুট হওয়া বেশির ভাগ জিনিসপত্রও উদ্ধার করা হয়েছিল বলে সে সময় জানানো হয়।

জনের পরিকল্পনা ছিল চট্টগ্রাম থেকে থাইল্যান্ডের দিকে যাওয়ার। কিন্তু সেখানে ডিজেলের সংকট থাকায় সেই যাত্রা আর সম্ভব হয়নি।

তারা আরও ডিজেল নিতে কক্সবাজারে এসেছিলেন। পথে সোনাদিয়ায় নোঙর করার সময় হামলার ঘটনা ঘটে বলে জানান জন।

সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী, অক্টোবর বা নভেম্বরের দিকে আইল্যান্ড গার্লে করে বাংলাদেশ ছাড়ার কথা ছিল তাদের। গন্তব্য নিউজিল্যান্ড। কিন্তু সেই যাত্রা আর হলো না।

দুর্ঘটনার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, আইল্যান্ড গার্ল কি আদৌ সমুদ্রে চলার উপযোগী ছিল? কাঠের গুঁড়ি দিয়ে জোড়া দেওয়া দুটি অংশ কি বঙ্গোপসাগরের বড় ঢেউ সামলাতে পারত? 

দুটি অংশের মাঝের বড় প্ল্যাটফর্মটি কি গভীর সমুদ্রে চলার মতো শক্ত ছিল? নৌকা তৈরিতে ব্যবহৃত কাঠের মানই বা কেমন ছিল?

জন অবশ্য মনে করেন, নকশায় সমস্যা ছিল না। তার দাবি, কাঠের নৌকা বানানোর অভিজ্ঞতা তার দীর্ঘদিনের। নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় ক্যাটামারান ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় বলেও তিনি জানান।

তার মতে, সমস্যাটা নকশায় না, সমস্যা ছিল কাঠে। দুটি অংশ জোড়া দেওয়ার জন্য সবচেয়ে ভালো মানের কাঠের গুঁড়ি কিনতে তিনি বেশি টাকা দিয়েছিলেন।

কিন্তু নৌকা তৈরি হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারেন, কিছু কাঠ তার প্রত্যাশামতো ভালো মানের ছিল না। পরে নৌকায় বড় ধরনের তেলাপোকার উপদ্রবও দেখতে পান তিনি। জনের দাবি, নিউজিল্যান্ডের উত্তাল সমুদ্রের কথা মাথায় রেখেই নৌকাটি তৈরি করা হয়েছিল। 

তবে এগুলো জনের বক্তব্য। নৌকাটি কেন ভেঙে গেল, তার প্রকৃত কারণ জানতে আরও তদন্ত ও কারিগরি পরীক্ষা প্রয়োজন।

পরিবারটি বাংলাদেশে এসেছিল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তারা পোর্ট এন্ট্রি ভিসা নিয়ে দেশে ঢুকেছিল। কয়েকবার ভিসার মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তারা বাংলাদেশে ছিল।

জন বলেন, তাদের ভিসার মেয়াদ দুইবার শেষ হয়েছিল। এর মধ্যে এ কারণে একবার জরিমানা দিয়ে তারা বাংলাদেশ ছাড়েন।

সাধারণত চট্টগ্রাম থেকেই তারা ভিসার মেয়াদ বাড়াতেন। তাদের সর্বশেষ ভিসার মেয়াদ শেষ হয় ২০২৬ সালের ২৪ মে। এই ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা মেটাতেই তারা চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন। সেই যাত্রা শেষ হয় নাজিরারটেকে।

দুর্ঘটনার পর পরিবারটির সামনে এখন ভিন্নরকম বাস্তবতা।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শহীদুল আলম জানান, দুর্ঘটনার পর জেলা প্রশাসন তাদের একটি হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করেছে। তাদের খাবারের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে। পরিবারটির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। পুলিশ নিরাপত্তাও দেওয়া হচ্ছে।

দুর্ঘটনায় বেলা ও জনের টাকা, ব্যাংকসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং অন্যান্য মূল্যবান জিনিস হারিয়ে গেছে। অনেক জিনিস এখনো পাওয়া যায়নি।

আইল্যান্ড গার্লের দুটি অংশ এখনো টিকে আছে। জন সেগুলো বিক্রি করে পরিবারের জরুরি খরচ চালানোর জন্য টাকা জোগাড় করতে চান।

জন জানিয়েছেন, পরিবারের পরিস্থিতির কথা তিনি শ্রীলঙ্কায় নিউজিল্যান্ডের দূতাবাসকে জানিয়েছেন। তবে যে ধরনের সহায়তা তিনি আশা করেছিলেন, তা এখনো পাননি।

এই মুহূর্তে তার একটাই চাওয়া। তিনি বাংলাদেশে থাকতে চান। অন্তত ছেলে আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত। সেজন্য প্রস্তুতিও নিচ্ছে পরিবারটি।

আইল্যান্ড গার্লের স্বপ্ন তাদের থেমে গেছে। তবে সমুদ্রের তীরে পড়ে আছে সেই স্বপ্নের ভাঙা দুই অংশ।

 

Related Articles

Latest Posts