অতিমাত্রায় শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসে কমছে সামুদ্রিক মাছের মজুত

বছরের পর বছর অতিরিক্ত মাছ আহরণ, ক্ষতিকর পদ্ধতিতে মাছ ধরা ও সামুদ্রিক আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে বাংলাদেশের সমুদ্রে মাছের মজুত উদ্বেগজনক হারে কমছে। এর প্রভাব পড়েছে ইলিশসহ বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছের আহরণে।

উৎসে মাছ কমে যাওয়ায় ক্রমেই সংকটে পড়ছেন উপকূলীয় অঞ্চলের জেলেরা।

কম মাছ পাওয়ায় অনেক জেলে ট্রলারের জ্বালানি, খাবারসহ সমুদ্রযাত্রার খরচও তুলতে পারছেন না।

সম্প্রতি আলীপুরের মাছ অবতরণকেন্দ্রগুলো পরিদর্শনের সময় ট্রলার এফবি নূরজাহান–এর মালিক মিজান হোসেন জানান, গত বছরের তুলনায় এ বছর তার মাছ আহরণের পরিমাণ অন্তত ৪০ শতাংশ কমেছে।

এর পেছনে সমুদ্রে ব্যাপকভাবে অবৈধ ট্রলিং বা ক্ষতিকর জালের ব্যবহারকে দায়ী করেন তিনি।

মিজান হোসেন বলেন, ‘ট্রলিং জালে আকার ও প্রজাতিনির্বিশেষে সব ধরনের মাছ ধরা পড়ে। জালে আটকা পড়ার পর ছোট মাছগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মারা যায়।’

কুয়াকাটার পার্শ্ববর্তী মহিপুর মৎস্যজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি ফজলু গাজী জানান, গত চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এ বছর ইলিশের আহরণ সবচেয়ে কম দেখেছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘প্রতিবছর জেলেদের অগ্রিম টাকা দেওয়া হয়। কিন্তু মাছের পরিমাণ এতটাই কমে গেছে যে সেই অগ্রিম টাকাও এখন ফেরত পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।’

পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় নন্দীও মাছের আহরণ উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, ‘শুধু ইলিশ নয়, অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের আহরণও কমেছে। আমাদের হিসাবে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর সামগ্রিকভাবে মাছ আহরণ প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে।’

কক্সবাজারেও একই চিত্র

কক্সবাজারের পরিস্থিতিও ভিন্ন নয়। শাহ্ জব্বারিয়া ফিশ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘একটা সময় একেকটি ট্রলার সমুদ্রে গিয়ে দেড় থেকে দুই টন পর্যন্ত ইলিশ নিয়ে ফিরত। এখন একই পরিমাণ ইলিশ সংগ্রহ করতে কয়েকটি ট্রলারের প্রয়োজন হচ্ছে।’

জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে একটি ট্রলারের প্রতিবার সমুদ্রযাত্রায় প্রায় চার লাখ টাকা ব্যয় হয়। অন্যান্য প্রজাতির মাছ ধরা পড়লেও সামগ্রিকভাবে সেই পরিমাণ এতটাই কম যে অনেক ট্রলারকে লোকসান গুনতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।

কুতুবদিয়ার বাসিন্দা মোহাম্মদ রমিজ। লেদু মাঝি নামে পরিচিত রমিজ মহিউদ্দিন কোম্পানির মালিকানাধীন একটি ট্রলার পরিচালনা করেন। তিনি বলেন, সামান্য মাছের আশায় জেলেদের এখন সমুদ্রে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

তার ভাষায়, ‘সমুদ্রে এখন মাছ নেই বললেই চলে। জাল ফেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রায়ই খুব অল্প মাছ পাওয়া যাচ্ছে।’

চলতি বছরের ২৩ জুলাই ৬৫ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ার পর তার ট্রলারটি ১০ বার সমুদ্রে গেছে। এতে প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে, আর মাছ বিক্রি করে আয় হয়েছে প্রায় ৪২ লাখ টাকা।

অথচ অতীতে একটি ট্রলার একবার সমুদ্রে গিয়ে ১০ লাখ থেকে ৪০ লাখ টাকার মাছ নিয়ে ফিরত বলে জানান তিনি।

অগভীর সমুদ্রে ক্রমবর্ধমান ট্রলিং জালের ব্যবহার মাছের মজুত কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেন লেদু মাঝি।

একসময় গভীর সমুদ্রে চলাচলকারী বড় জাহাজে ট্রলিংয়ের ব্যবহার সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন কাঠের তৈরি ট্রলারেও অগভীর সমুদ্রে এ পদ্ধতিতে মাছ ধরা হচ্ছে। এতে সামুদ্রিক আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কমবয়সী মাছ ও পোনাও মারা যাচ্ছে।

সরকারি তথ্যেও উৎপাদন কমার প্রমাণ

জেলেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে সরকারি তথ্যেরও মিল পাওয়া যাচ্ছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে দেশে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ১৭ হাজার টন। ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বেড়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে এ সংখ্যা পৌঁছায় রেকর্ড ৭ লাখ ৬ হাজার টনে ।

তবে এরপর টানা চার বছর ধরে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন কমছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রাথমিক হিসাবে সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ১৫ হাজার টন। এটি গত ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন এবং সর্বোচ্চ উৎপাদনের তুলনায় প্রায় ২৭ শতাংশ কম।

মৎস্য অধিদপ্তরের ব্লু ইকোনমি বিভাগের সিনিয়র সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শরিফুল আজম জানান, সামুদ্রিক মাছের সামগ্রিক উৎপাদন কমার সঙ্গে ইলিশের আহরণ হ্রাসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। কারণ, দেশের মোট সামুদ্রিক মাছ আহরণের প্রায় ৪০ শতাংশই ইলিশ।

দূষণ, আবাসস্থলের পরিবর্তন ও অতিরিক্ত শিকার

মৎস্য বিশেষজ্ঞ শরিফুল বলেন, ইলিশের উৎপাদন কমার পেছনে নদী ও সমুদ্রের দূষণ, আবাসস্থলের পরিবর্তন এবং অতিরিক্ত মাছ শিকার প্রধান কারণ।

‘দূষণের কারণে নদী ও মাছের প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে ইলিশের ডিম ফোটার হার এবং ছোট মাছের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে,’ বলেন তিনি।

এছাড়া বিভিন্ন এলাকায় পানির নিচে চর ও বালুর বাঁধ তৈরি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এগুলো ‘ডুবোচর’ নামে পরিচিত। এসব ডুবোচরের কারণে সমুদ্র ও নদীর মধ্যে ইলিশের চলাচলের পথ অগভীর হয়ে পড়ছে এবং তাদের স্বাভাবিক বিচরণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অতিরিক্ত মাছ শিকার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশের প্রায় ৩০ হাজার ছোট ও মাঝারি আকারের মাছ ধরার নৌকার ৮৫ শতাংশের বেশি ইলিশ শিকারের সঙ্গে যুক্ত। বছরের পর বছর অতিরিক্ত আহরণের ফলে ইলিশের মজুত কমে যাচ্ছে।

অন্যান্য সামুদ্রিক মাছও হুমকিতে

সমস্যা শুধু ইলিশেই সীমাবদ্ধ নয়। শরিফুল বলেন, ‘বেহুন্দি জাল বা মোহনা এলাকায় ব্যবহৃত সেট ব্যাগ নেট নির্বিচারে বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ ধরে ফেলছে। বিশেষ করে মাছের পোনা ও কমবয়সী মাছ ব্যাপকভাবে এ জালে আটকা পড়ছে।’

বারবার অভিযান চালানো হলেও এই জালের ব্যবহার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এছাড়া বরগুনা, পটুয়াখালী ও কলাপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় মনোফিলামেন্ট গিলনেট এবং অবৈধ ট্রল ডোর ও জালের ব্যবহারও মাছের মজুত কমার পেছনে দায়ী বলে জানান তিনি।

ফিরতে পারে মাছের মজুত, তবে লাগবে সময়

শরিফুল জানান, মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা, সমুদ্রে টহল জোরদার করা এবং মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ধীরে ধীরে সামুদ্রিক মাছের মজুত পুনরুদ্ধার করা সম্ভব।

তবে ইতোমধ্যে কমে যাওয়া মাছের মজুত আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে কয়েক বছর সময় লাগবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

মাছ ধরার নৌযান পর্যবেক্ষণে ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। চট্টগ্রামের ফিশারিজ মনিটরিং সেন্টারকে এ ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

এ উদ্যোগ নিয়ে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানা গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, মাছ ধরার নৌযানগুলোকে ট্র্যাকিং ব্যবস্থার আওতায় আনা গেলে—অবৈধ মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।

একইসঙ্গে জেলে ও ট্রলার মালিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

Related Articles

Latest Posts