পাবনার বেড়া উপজেলার চরাঞ্চলের এক লাখেরও বেশি মানুষের জরুরি স্বাস্থ্যসেবার একমাত্র ভরসা ছিল একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স। কিন্তু কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে যমুনা তীরের দুর্গম চরের বাসিন্দাদের জন্য জরুরি চিকিৎসাসেবা এখন বিভীষিকায় পরিণত হয়েছে।
চরের মানুষের কাছে অসুস্থতা মানে শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, বরং সময় আর প্রতিকূল ভৌগোলিক বাস্তবতার সঙ্গে এক কঠিন লড়াই।
চর পেঁচাকোলার গ্রাম প্রধান মো. ইব্রাহিম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কেউ অসুস্থ হলে পুরো পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়ে। প্রথমে ঘোড়ার গাড়িতে করে বালুচর পাড়ি দিয়ে নদী তীরে যেতে হয়। এরপর নৌকা খুঁজে মূল ভূখণ্ডে গিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পৌঁছাতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দূরত্ব মাত্র ৭ থেকে ৮ কিলোমিটার হলেও যমুনার দুর্গম পথ পাড়ি দিতে সময় লেগে যায় ২ থেকে ৩ ঘণ্টা।’
জরুরি মুহূর্তে জীবন বাঁচাতে এই চরের শতাধিক পরিবার নিজেদের এক বিশেষ নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে। প্রত্যেকের মোবাইল ফোনে স্থানীয় মাঝিদের নম্বর ‘স্পিড ডায়ালে’ রাখা থাকে। গভীর রাতেও মাঝিরা সজাগ থাকেন, যেন কেউ অসুস্থ হলে দ্রুত নদী পার করা যায়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন অন্তঃসত্ত্বা নারীরা।
ইব্রাহিম জানান, চরে কোনো চিকিৎসক আসেন না। প্রসবকালীন জটিলতা দেখা দিলে তারা হাসপাতালে পৌঁছানোর সময় পান না, ফলে বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে নার্স এনে বাড়িতেই প্রসবের ব্যবস্থা করতে হয়।
একই অবস্থা বেড়াও উপজেলার চরাঞ্চলের গ্রাম—চর নাগদহ, হাতিয়াল আড়িয়াল, চরপাইকনদ, চর সাফুল্য, দিওয়ানি, চর আগ বাকসুয়াল, চর পাগলা, শরীফপুরসহ প্রায় ২০-২২টি চরের।
প্রায় লক্ষাধিক চরবাসীর একমাত্র ভরসা সরকারি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কিন্তু সেখানে পৌঁছানোই তাদের জন্য সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ—পথের কষ্ট আর প্রতিকূলতার কারণে চিকিৎসা নেওয়াটাই হয়ে ওঠে কঠিন।
যমুনা সমাজ কল্যাণ সংস্থার নির্বাহী পরিচালক মো. মনজেদ আলী ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘পদ্মা ও যমুনার চরের মানুষ স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত। অনেক রোগী হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান, তাদের মৃত্যু কখনোই সরকারি রেকর্ডে আসে না।’
বেড়া উপজেলার ২২টি চরের জন্য ২০১৩ সালে কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (সিএমএসডি) একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স বরাদ্দ দেয়। কিন্তু দীর্ঘ ১৩ বছরেও সেটি একদিনের জন্য সেবায় আসেনি।
স্থানীয় কলেজশিক্ষক মো. আবুল কালাম ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দরিদ্র মানুষের জন্য আসা একটি অ্যাম্বুলেন্স রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাবে, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এটি সচল থাকলে আমাদের বোনদের ও মুমূর্ষু রোগীদের এভাবে কষ্ট পেতে হতো না।
বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. তাহমিনা ইয়াসমিন ডেইলি স্টারকে বলেন, অ্যাম্বুলেন্সটি বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেটির জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ বা চালকের জন্য কোনো বাজেট ছিল না। বর্তমানে অ্যাম্বুলেন্সটির ইঞ্জিনটির কোনো হদিস নেই। কেবল একটি কঙ্কালসার কাঠামো হিসেবে পড়ে আছে।
‘এমনকি এই প্রকল্পের ব্যয় বা যন্ত্রাংশ হারিয়ে যাওয়ার বিষয়ে কোনো দাপ্তরিক নথিপত্রও পাওয়া যাচ্ছে না’, বলেন তিনি।
জানতে চাইলে বেড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুরেন মায়েশা খান ডেইলি স্টারকে বলেন, নৌ অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবাটি পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা চরাঞ্চলের স্থায়ী বাসিন্দাদের কষ্টের বিষয়টি অনুধাবন করছি। কোনো রোগীকে যেন ডাক্তার দেখাতে গিয়ে জীবন ঝুঁকিতে না ফেলতে হয়, সেজন্য আমরা অ্যাম্বুলেন্সটি চালুর চেষ্টা করছি।’

